গাজী টায়ারসের ছয়তলা ভবনে আগুন লাগার পর টানা পাঁচ দিন জ্বলেছিল সেই আগুন। ১৮২ জন মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু তাদের লাশও পরিবারের লোকেরা পায়নি। কারণ যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সেখানে কাউকে ঢুকতেই দেয়নি। এটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, তদন্ত রিপোর্টেও স্পষ্ট লেখা আছে এটা ছিল পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ। কিন্তু এই ১৮২ জনের মৃত্যুর জন্য একটি মামলাও হয়নি, একজন মানুষকেও গ্রেফতার করা হয়নি।
যে সরকার জুলাই মাসে রক্তাক্ত দাঙ্গার মাধ্যমে নির্বাচিত একটি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের আমলেই ঘটেছে এই গণহত্যা। মুহাম্মদ ইউনূস আর তার তথাকথিত উপদেষ্টা পরিষদ ক্ষমতায় বসেছিল শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কিন্তু বাস্তবে তারা যা করেছে তা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়তে দেওয়া। গাজী টায়ারসে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত টানা লুটপাট চলেছে, অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যও সেখানে যায়নি। এটা কি অক্ষমতা, নাকি ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা?
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যা লেখা আছে তা পড়লে মনে হয় এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা ছিল না। স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে মানুষকে ডাকা হয়েছে, একবার নয়, দুইবার। প্রথমে বলা হয়েছে জমি দখলদারদের জড়ো হতে, পরে বলা হয়েছে ডাকাত ঢুকেছে তাদের প্রতিহত করতে। এই ধরনের পরিকল্পিত সমাবেশের পেছনে কারা ছিল, কেন তারা এমনটা করল, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি।
ইউনূসের সরকার বলে থাকে তারা বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এসেছে। কিন্তু ১৮২ জনের মৃত্যুর বিচার কোথায়? ১২৪৩টি কারখানায় হামলার বিচার কোথায়? উত্তর হলো কোথাও নেই। কারণ যারা এই সন্ত্রাস চালিয়েছে, তারাই হচ্ছে এই সরকারের ভিত্তি। যে মবকালচার দিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছে, সেই মবকালচারকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, বা চাইছে না।
মতিঝিল, গুলশান, তেজগাঁও থেকে শুরু করে বারিধারার কূটনৈতিক এলাকা পর্যন্ত কোথাও নিরাপত্তা নেই। ব্যাংকপাড়ায় দিনের বেলা ভবন দখলের চেষ্টা হচ্ছে। গুলশানের মতো এলাকায় বাড়িতে ঢুকে লুটপাট চলছে। আর এসব ঘটনায় যারা ধরা পড়ছে তাদের সংখ্যা হাতেগোনা। মতিঝিলে ৩০-৩৫ জনের মব থানায় হামলা করতে গেলে গ্রেফতার হয়েছে মাত্র তিনজন। বাকিরা? তারা আবার পরেরবার নতুন কোনো লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করবে।
ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থনে। তারা বলেছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে, মানবাধিকার রক্ষা হবে। কিন্তু বাস্তবে যা হয়েছে তা হলো সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে উৎখাত করে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, তাদের হাতে অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আর ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
বিইএফের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সরাসরি বলেছেন যে বিনিয়োগ হচ্ছে না কারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন ব্যবসায়িক আস্থা কমে গেছে। এই দুই সংগঠনের প্রধানরা কিন্তু রাজনৈতিক কর্মী নন, তারা ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি। তারা যখন খোলাখুলি বলছেন যে পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর, তখন বুঝতে হবে বিষয়টা কতটা গভীর।
আর এই সবকিছুর মূলে রয়েছে ইউনূসের সরকারের অবৈধতা। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তাদের কোনো গণভিত্তি নেই, আর তাই তারা কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যে মবকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় এসেছে, সেই মবই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, এমনকি সাধারণ সম্পত্তিশালীদের বিরুদ্ধেও এখন যে কেউ মব নিয়ে হামলা করতে পারছে। আর সরকার নীরব দর্শক হয়ে বসে আছে।
গাজী টায়ারসের ১৮২ জন মৃত মানুষের পরিবারগুলো এখনো অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয়জনদের লাশের জন্য। কিন্তু সেই লাশ তারা কখনো পাবে না, কারণ যারা ক্ষমতায় আছে তারা সেই ভবনেই কাউকে ঢুকতে দেয়নি। এটা শুধু অবহেলা নয়, এটা হচ্ছে সুপরিকল্পিত প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা। কারণ যদি সেই ভবনে গিয়ে সত্যিকারের তদন্ত হতো, তাহলে হয়তো বেরিয়ে আসত কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল।
ইউনূস আর তার দল এসেছিল সংস্কারের নামে। কিন্তু তারা যা করছে তা হলো ধ্বংস। অর্থনীতি ধ্বংস, আইনশৃঙ্খলা ধ্বংস, আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো ন্যায়বিচারের ধারণাটাই ধ্বংস। একটা দেশ যেখানে ১৮২ জন মানুষ পুড়ে মরতে পারে আর তার কোনো বিচার হয় না, সেই দেশে আর কোনো আইনের শাসন আছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

