একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই শোককে অজুহাত বানিয়ে পুরো দেশের মানুষের উৎসব পালনে বাধা দেওয়া কোন যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য? খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, সাথে সাথে নিষিদ্ধ করা হয়েছে থার্টি ফার্স্টের সব ধরনের উদযাপন। আতশবাজি, পটকা, ডিজে পার্টি, শোভাযাত্রা সবকিছুতেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। প্রশ্ন হলো, একজন মানুষের মৃত্যুতে কেন পুরো জাতির আনন্দ-উৎসবকে জোরপূর্বক থামিয়ে দিতে হবে?
ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, যারা জুলাই মাসের রক্তাক্ত দাঙ্গার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, তারা এখন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তাদের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের নতুন রূপ। যে মানুষগুলো সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে, হয়তো বছরের এই একটি রাতই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু আনন্দ করার সুযোগ পায়, সেই সুযোগও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মতাদর্শিক সহযোগীরা বরাবরই বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পহেলা বৈশাখ হোক, থার্টি ফার্স্ট হোক, যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক উদযাপনে তাদের অস্বস্তি প্রকট। তারা চায় বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো একটি কঠোর ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে মানুষের আনন্দ-উৎসব সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত থাকবে তাদের মতাদর্শের ছাঁকনিতে। ওহাবী চিন্তাধারার এই দালালদের কাছে সংগীত, নাচ, উৎসব সবকিছুই অশ্লীল, নিষিদ্ধ।
যে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে এই অবৈধ ক্ষমতা দখল সম্ভব হয়েছে, তারাও এখন চুপচাপ বসে আছে। বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত এই পুরো প্রকল্পের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে ধ্বংস করা, এখানকার মানুষের চিন্তা-চেতনায় একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া। জুলাইয়ের দাঙ্গায় যে পরিকল্পিত সহিংসতা আমরা দেখেছি, তার পেছনে ছিল ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা। এখন তারা আরও সাহসী হয়ে উঠেছে, কারণ ক্ষমতায় আছে তাদেরই মতাদর্শিক সহযোগীরা।
শোক পালন একটি ব্যক্তিগত বিষয়। যারা খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা করতেন, তাদের অবশ্যই শোক প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু সেই শোক পালনের জন্য পুরো দেশকে থামিয়ে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। জীবন-মৃত্যু স্রষ্টার হাতে, এটা কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের জীবনযাত্রায় হস্তক্ষেপ করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিএনপি কি এখন থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে দিয়েছে? তারা কি ভুলে গেছে যে গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার আছে? একটি রাজনৈতিক দলের নেতার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা যেতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বন্ধ করে দিতে হবে। এটা আসলে ক্ষমতার একটা প্রদর্শনী, যেখানে দেখানো হচ্ছে যে তারা চাইলেই যেকোনো কিছু নিষিদ্ধ করতে পারে।
সুদী মহাজন হিসেবে পরিচিত ইউনুস এখন যে ভূমিকায় আছেন, তা কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং একটি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা। তার সরকার এবং সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনগুলো মিলে বাংলাদেশকে যে পথে নিয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হচ্ছে যে তারা একটি উদার, সহনশীল, সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চায় না। তারা চায় একটি নিয়ন্ত্রিত, দমবন্ধ সমাজ, যেখানে মানুষ ভয়ে আর বাধ্যবাধকতায় জীবনযাপন করবে।
থার্টি ফার্স্ট শুধু একটি তারিখ নয়, এটি নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর একটি প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ এই রাতে আনন্দ-উৎসব করে, স্বপ্ন দেখে নতুন বছরের। বাংলাদেশেও এই ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন সেটাও নিষিদ্ধ করা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। এই নিষেধাজ্ঞা আসলে একটি পরীক্ষা, দেখা হচ্ছে মানুষ কতটা সহ্য করতে পারে, কতটা মেনে নেয়। আজ যদি থার্টি ফার্স্ট নিষিদ্ধ করা যায়, কাল পহেলা বৈশাখ, তারপর আরও কিছু।
যে দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে, যেখানে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, সেই দেশে এখন মানুষ ঠিকমতো আনন্দ করতে পারছে না। এটা কোনো স্বাধীন দেশের চিত্র নয়, এটা একটা অধিকৃত দেশের চিত্র, যেখানে বিদেশী স্বার্থ আর ধর্মীয় উগ্রবাদ মিলে একটা নতুন শৃঙ্খল তৈরি করছে। আর সেই শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন।

