২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত তথাকথিত ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ কি নিছক সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ছিল, নাকি এর নেপথ্যে ছিল জামায়াত-শিবির ও আন্তর্জাতিক অপশক্তির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র? সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কদের স্বীকারোক্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন মেরুকরণ এই প্রশ্নকে এখন দিবালোকের মতো সত্য প্রমাণ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে মূলত একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সবচেয়ে বড় বোমাটি ফাটিয়েছেন অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। গত রবিবার তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সেখানে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, ৫ আগস্ট রাতে এক জামায়াত নেতার বাসায় বৈঠকের মাধ্যমেই বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার শুরু। নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ তুলে তিনি এই ষড়যন্ত্রের পূর্ণতার কথা জানান।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির সভাপতি সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেনের দাবি আন্দোলনকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, আন্দোলনের প্রধান মুখ নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম সরাসরি শিবিরের সঙ্গে পরামর্শ করে কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। এমনকি আন্দোলনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক স্লোগান “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার”—মূলত শিবিরের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি কনসেপ্ট ছিল, যা সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।
আন্দোলনের পর জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এলডিপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, এই দলগুলো মূলত জামায়াতেরই ‘গুপ্ত অংশ’ হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে এনসিপির মতো দলগুলো রাজাকারের বংশধরদের প্রতিনিধিত্ব করে শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে রাজপথে নামিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও ড. ইউনূস ফ্যাক্টর: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের নেপথ্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং আন্তর্জাতিক মহলের একটি শক্তিশালী হাত ছিল। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে ড. ইউনূসকে এই ষড়যন্ত্রের ‘প্রক্সি নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জামায়াত ও শিবিরের মতো উগ্রবাদী সংগঠনগুলো মাঠপর্যায়ে সহিংসতা উস্কে দিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করা।
কোটা সংস্কারের সাধারণ দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ১ জুলাই যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই সহিংস রূপ নেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আড়ালে থেকে জঙ্গি সংগঠনগুলো পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা করে ‘রাজাকার’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করার মাধ্যমে তারা তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা করেছে।
সংকটে দেশের সার্বভৌমত্ব: বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ২০২৪ সালের এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে থাকবে। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের লেবাসে বহিরাগত ও জঙ্গি অপশক্তির এই অনুপ্রবেশ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার এই ষড়যন্ত্র বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও ষড়যন্ত্রের এই সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর এখন জনমনে প্রশ্ন—সাধারণ ছাত্ররা কি কেবলই দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হলো?

