সংবর্ধনা—একসময় যা ছিল সম্মানের প্রতীক আজ তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক চাঁদাবাজির সাংগঠনিক কৌশলে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে প্রস্তাবিত সংবর্ধনার নামে দেশজুড়ে যে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে, তা আর বিচ্ছিন্ন গুঞ্জন নয়—এটি একটি বিস্তৃত, পরিকল্পিত এবং নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত অর্থনৈতিক নিপীড়নের চিত্র।
গ্রামের চায়ের দোকান, ভাঙাড়ির দোকান, ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোরিকশাচালক কেউই রেহাই পায়নি। আবার একইসঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ঠিকাদারদের কাছ থেকেও আদায় করা হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। কোথাও ‘দলীয় সিদ্ধান্ত’-এর অজুহাত, কোথাও নগ্ন হুমকি—চাঁদা না দিলে ব্যবসা বন্ধ, ঠিকাদারি বাতিল, এলাকায় টিকে থাকা অসম্ভব। এই যদি হয় বিরোধী দলের আচরণ, তবে ক্ষমতায় গেলে কী হবে—তা কল্পনা নয়, আতঙ্ক।
বিএনপি বছরের পর বছর রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার, দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নৈতিক ভাষণ দিয়ে এসেছে। অথচ আজ তারাই যদি সংবর্ধনার নামে হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, তাহলে সেই নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়? ক্ষমতার বাইরে থেকেই যদি এমন অর্থনৈতিক সন্ত্রাস চলে, ক্ষমতায় গেলে তা যে রাষ্ট্রীয় লুটপাটে রূপ নেবেএটা আর আশঙ্কা নয়, ইতিহাসসমর্থিত বাস্তবতা।
সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দিক হলো—এই চাঁদাবাজির ভার চাপানো হয়েছে গরিব মানুষের কাঁধে। যে অটোরিকশাচালক সারাদিন খেটে ৫০০ টাকা রোজগার করে, তার কাছ থেকেও ‘নেতার সংবর্ধনা’র নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক অনিয়ম নয়—এটি সরাসরি অর্থনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক অপরাধ।
তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে এতদিন যে ‘নতুন বিএনপি’, ‘সংস্কার’, ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তর’-এর গল্প শোনানো হয়েছে, এই অভিযোগগুলো সেই সব শব্দকে অর্থহীন করে দেয়। তিনি যদি এসব জানেন এবং নীরব থাকেন, তবে দায় এড়াতে পারেন না। আর যদি না জানেন, তবে প্রশ্ন ওঠে তিনি আসলে কীসের নেতা?
বাংলাদেশের মানুষ আর সংবর্ধনা চায় না। তারা চায় নিরাপদ জীবন, কাজের নিশ্চয়তা, ন্যায্য রাজনীতি। সংবর্ধনার নামে চাঁদাবাজি মানে জনগণের পকেট কেটে নেতার ছবি টাঙানো।
ইতিহাস ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিগত বিএনপি–জোট সরকারের আমলে হাওয়া ভবন গড়ে তারেক জিয়ার চাঁদাবাজি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছিল। আজ সেই পুরোনো ছায়াই নতুন নামে, নতুন প্যাকেটে ফিরে আসছে। এই রাজনীতি বদল না হলে সরকার বদলালেও শোষণ বদলাবে না শুধু মুখ বদলাবে।

