বাংলাদেশ আজ যে গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি, তার কেন্দ্রে রয়েছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু দেশের মানুষের একটি বড় অংশের অভিযোগ ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চায় না। বরং যেকোনো মূল্যে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন আয়োজন করে নিজেদের পছন্দের একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করার দিকেই প্রশাসনের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত।
এই বাস্তবতায় সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে একটি স্পষ্ট বার্তা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—ইউনুস সরকারের অধীনে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনকালীন পরিবেশ তৈরির ন্যূনতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে অনুপস্থিত—এমনটাই মনে করছে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী।
প্রহসন নির্বাচনের আশঙ্কা ও জনমতের বিচ্ছিন্নতা
দেশের স্বার্থে যেখানে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে প্রশাসনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম প্রহসন নির্বাচনের আশঙ্কাকেই আরও দৃঢ় করছে। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছে এ ধরনের নির্বাচন জনগণের প্রকৃত ম্যান্ডেট প্রতিফলিত করবে না
বরং এটি হবে একটি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া। এই কারণেই ক্রমশ শক্তিশালী জনমত গড়ে উঠছে যে, নির্বাচনের আগেই ইউনুস প্রশাসনের বিদায় প্রয়োজন। এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয় বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নে একটি মৌলিক অবস্থান।
সুষ্ঠু নির্বাচন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংকট
বাংলাদেশ আজ এক গভীর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে জাতীয় নির্বাচন যার ওপর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। এমন এক সময়ে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সরকারের সম্পর্ক যদি শীতলতা থেকে শত্রুতায় রূপ নেয়, তবে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হতে পারে, তা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
খলিল সাহেব জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ার পর সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি কথিত চিঠি ইস্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সরকার পরবর্তীতে একে গুজব বলে অস্বীকার করলেও ততক্ষণে অবিশ্বাসের বীজ গভীরভাবে রোপিত হয়ে যায়। এমনকি জেনারেল ওয়াকারের বিদায় প্রস্তুতির গুঞ্জনও শোনা যায় যা প্রমাণ করে রাষ্ট্র কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে।
নির্বাচনের আগে যে আস্থা পুনর্গঠন হয়নি
নির্বাচনের আগে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে পেশাদার, আস্থাভিত্তিক ও সংবিধানসম্মত সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। কারণ, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এই সম্পর্ক আরও দূরে সরে যাচ্ছে। যদি বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যদি ডুয়েল কমান্ড বা নির্দেশনার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তাহলে নির্বাচনের সময় বড় ধরনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট সৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দায় চাপানোর রাজনীতি শুরু হলে পুরো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাই ভেঙে পড়বে।
খলিল–পিনাকি সিন্ডিকেট
এই প্রেক্ষাপটে খলিল সাহেবকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা করার আলোচনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খলিল সাহেবের সঙ্গে পিনাকি ইলিয়াসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সেনাবাহিনীর বর্তমান কমান্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দীর্ঘদিনের প্রচারণা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও দুর্বল করেছে।
নিজেদের ভাষায় ‘অর্জুন–কৃষ্ণ’ সম্পর্কের এই জুটি গত এক বছরে রাষ্ট্রকে কী দিয়েছে—এই প্রশ্ন আজ সর্বত্র। সমালোচকদের মতে, এই সময়জুড়ে একের পর এক প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের বিশ্বাস ক্ষয় হয়েছে এবং প্রশাসনের ভেতরে ভয় ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পদোন্নতি ও বদলি নিয়ে সিন্ডিকেটতন্ত্রের অভিযোগ, ভিডিও বানিয়ে চাপ সৃষ্টি করার ভয়—সব মিলিয়ে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা আজ গভীর সংকটে।
নির্বাচন কার হাতে, রাষ্ট্র কার স্বার্থে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই এসে দাঁড়ায়—এই নির্বাচন কার হাতে? রাষ্ট্রের, না কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর? বাংলাদেশ কি জনগণের ইচ্ছায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্র থাকবে, নাকি কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত হবে?
যদি নির্বাচনের আগে ইচ্ছাকৃতভাবে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ানো হয়, যদি আর্মি বনাম সরকার কিংবা আর্মি বনাম নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।
সুষ্ঠু নির্বাচনই একমাত্র পথ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ একটিমাত্র বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে আস্থার সংকট দূর করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা এই দূরত্ব আরও বাড়ায়, তাহলে ধরে নিতে হবে—লক্ষ্য সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ফলাফল।

