বাংলাদেশ এমন একটি নির্বাচনী কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে দেশটির বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত যেকোনো নির্বাচন কেবল বৈধতার সংকটই তৈরি করবে না, বরং বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক হবে।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধুই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু নয়। বরং এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারতের নিরাপত্তা পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে, বিশেষ করে ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায়। ফলে বাংলাদেশে কী ঘটছে, তা কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়; দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনকে রাজনৈতিক বৈধতা এবং টেকসই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। নয়াদিল্লির কৌশলগত মূল্যায়ন হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চরমপন্থা, অস্থিতিশীলতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের ঝুঁকি কমায়।
তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখার অর্থ কার্যত দেশের বৃহত্তম ভোটব্যাংককে বাদ দেওয়া, যা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ধ্বংস করবে এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা স্বার্থের ওপর।
আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়ার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির জন্য নয়। এটি ভারত-বিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী ইসলামি উগ্রগোষ্ঠীগুলোর জন্যও বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এখন প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। তাদের বক্তব্যে ভারতের প্রতি বিদ্বেষ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে মূলধারার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে তরুণদের মধ্যে তাদের সাংগঠনিক প্রভাব বাড়ছে এবং চরমপন্থী রিক্রুটমেন্টের বাধা কমছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে উগ্রবাদী হিযবুত তাহরীরের পুনরুত্থান হয়েছে। নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন হিযবুত তাহরীর আবার প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করেছে। তারা সরাসরি ভারতকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে উগ্র ইসলামি শাসনের আহ্বান জানাচ্ছে এবং রাজনৈতিক উত্তরণকালকে কাজে লাগিয়ে নতুন নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করছে।
পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংযোগ
নিরাপত্তা প্রতিবেদনে পাকিস্তান-ভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তৎপরতার তথ্য উঠে এসেছে। এমনকি জঙ্গি কমান্ডাররা প্রকাশ্যে দাবি করেছে যে, তারা ভারতের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাংলাদেশকে করিডোর হিসেবে ব্যবহারের পথ খুঁজছে।
ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক বয়ান
কিছু রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ ভাষ্যকার ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তুলছে। এই বক্তব্য জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে জনমনে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াচ্ছে।
পাকিস্তানের কৌশলগত সক্রিয়তা
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের ঘনঘন সফর একটি সম্ভাব্য কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সব ঘটনা মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এগুলো হলো- আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি। চরমপন্থা দমনে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল হওয়া। ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু—হিন্দু, খ্রিস্টান ও আহমাদিয়া মুসলিমদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে উগ্রপন্থীরা পরিকল্পিত সহিংসতা ও উচ্ছেদে জড়াতে পারে। এর প্রভাব ভারতের ওপরও পড়তে পারে—শরণার্থী চাপ বৃদ্ধি এবং সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি একটি বর্জনমূলক বা কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী শক্তিগুলো ক্ষমতায় আসে, তবে—
সীমান্ত অস্থিরতা চরম আকার নেবে, সন্ত্রাসবাদ দমনে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা ভেঙে পড়বে। পাশাপাশি পাকিস্তান বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটাতে পারবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত এই পরিস্থিতিকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ হারিয়েছে। নয়াদিল্লির উচিত হবে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা, সমমনা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া।
বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। একটি বর্জনমূলক নির্বাচনকে বিনা বাধায় চলতে দেওয়া হবে ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভুল। গণতান্ত্রিক ক্ষয় রোধ, চরমপন্থীদের সংহত হওয়া ঠেকানো এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এড়াতে ভারতকে এখনই কার্যকর ও সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা নিতে হবে।

