রাজশাহী বিভাগে বিগত এগারো মাসে প্রায় এক হাজারেরও বেশি চুরি, ডাকাতি আর ছিনতাইর ঘটনা ঘটেছে। থানায় মামলা হয়েছে ৫৯টি ডাকাতি, ১০০টি ছিনতাই আর ৯২৭টি চুরির। কিন্তু এটা তো শুধু হিমশৈলের চূড়া। যেসব ঘটনার মামলাই হয়নি, সেগুলো নাকি এর কয়েকগুণ বেশি। বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা ছিনতাই করে মাথায় আঘাত করে ফেলে রাখা হচ্ছে, হিমাগারে ডাকাতি পড়ছে, নদীতে স্পিডবোট নিয়ে গিয়ে সোনার দোকান লুট হচ্ছে, এমনকি চুরি করতে গিয়ে মানুষ পিটিয়ে মারা যাচ্ছে। আর সাধারণ মানুষ? তারা এখন রাত জেগে নিজেদের বাড়িতে পাহারা দিচ্ছে।
এই যে পরিস্থিতি, এটা কিন্তু হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। জুলাই মাসে যখন দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রীদের নামে দাঙ্গা বাঁধিয়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হলো, তখন থেকেই এই বিশৃঙ্খলার বীজ বপন হয়েছিল। মুহাম্মদ ইউনুস আর সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান যে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় বসেছেন, তার ফলাফল এখন রাজশাহীর রাস্তায় রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা যন্ত্র এখন কার নির্দেশ শুনবে, কার কাছে জবাবদিহি করবে, সেটাই যখন পরিষ্কার নয়, তখন অপরাধীরা তো মাঠ ফাঁকা পাবেই।
যে মানুষটি সারাজীবন সুদী ব্যবসা করে বিদেশি টাকায় পুষ্ট হয়েছেন, যিনি কখনো রাজনীতি করেননি, কখনো কোনো নির্বাচনে দাঁড়াননি, তিনি এখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা। আর পাশে আছেন একজন সেনাপ্রধান, যার সমর্থন না থাকলে এই পুরো নাটকটাই সম্ভব হতো না। জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে যারা রাস্তায় নামিয়েছিল তরুণদের, যারা পেছন থেকে সহিংসতায় ইন্ধন জুগিয়েছিল, তাদের মধ্যে ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোর ভূমিকা এখন আর গোপন কিছু নয়। আর বিদেশি রাষ্ট্রের টাকা? সেটা তো আরো পরিষ্কার। একটা দেশের সরকার পাল্টাতে যে বিশাল অঙ্কের অর্থ লাগে, সেটা দেশের ভেতর থেকে আসেনি, এটা সবাই জানে।
এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো দায়িত্বজ্ঞানহীন শাসনের চূড়ান্ত নমুনা। রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি নিজেই স্বীকার করছেন যে অপরাধ দমন করা যাচ্ছে না। পুলিশ টহল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ডাকাতরা স্পিডবোটে করে নদী দিয়ে এসে পুরো বাজার লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। লালপুরের রঘুনাথপুর গ্রামের মানুষ এখন রাত জেগে নিজেদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে কারণ তারা জানে পুলিশ এসে তাদের রক্ষা করতে পারবে না। ছয় মাসে একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে সাতটা ভ্যান চুরি হয়েছে। এই যে পরিস্থিতি, এটা কোনো সাধারণ অপরাধবৃদ্ধি নয়, এটা রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।
ইউনুস সাহেবের কাছে প্রশ্ন, আপনি যখন নোবেল পুরস্কারের জৌলুস নিয়ে বিদেশে বক্তৃতা দিতে যান, তখন কি রাজশাহীর সেই বিকাশ এজেন্ট নাসির উদ্দীনের কথা মনে পড়ে, যিনি এখন ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না? আপনার তথাকথিত সংস্কার কর্মসূচি কি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে? জয়পুরহাটের সেই প্রবাসীর পরিবারের কথা ভাবেন, যাদের বেঁধে মারধর করে দশ ভরি সোনা লুট করে নেওয়া হলো?
আর জেনারেল ওয়াকার, আপনি তো সেনাবাহিনীর প্রধান। আপনার দায়িত্ব ছিল দেশের সংবিধান রক্ষা করা, গণতন্ত্র রক্ষা করা। কিন্তু আপনি কি করলেন? একটা অবৈধ অভ্যুত্থানে সমর্থন দিলেন। আর এখন যখন সেই অভ্যুত্থানের ফলে সাধারণ মানুষ রাতে ঘুমাতে পারছে না, তখন আপনার কোনো জবাবদিহিতা নেই। সামরিক বাহিনী যখন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন এটাই হয়। পুলিশ বিভ্রান্ত থাকে কার নির্দেশ মানবে, আর অপরাধীরা সেই সুযোগে তাণ্ডব চালায়।
যে দেশে ট্রাক ভিড়িয়ে দোকানের শাটার ভেঙে দেড়শো বস্তা চাল চুরি হয়ে যায়, যেখানে সড়কে গাছ ফেলে দিয়ে ডাকাতি করা হয়, যেখানে মুরগি চুরি নিয়ে মানুষ খুন হয়, সেই দেশের শাসকদের কাছে কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না ক্ষমতায় বসে থাকার। জুলাইয়ের সেই সহিংসতার দায় এড়ানোর কোনো উপায় নেই। যারা তখন পরিকল্পিতভাবে একটা গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করলো, তারাই এখন এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী।
বগুড়ায় বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি হচ্ছে। নাটোরের চিনি কলে দুর্ধর্ষ ডাকাতি হচ্ছে। পাবনায় স্পিডবোট নিয়ে স্বর্ণের দোকান লুট হচ্ছে। এই সবকিছুর পেছনে একটাই কারণ, রাষ্ট্র এখন অবৈধ হাতে। যে মানুষগুলো কখনো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি, তারা এখন দেশ চালাচ্ছে। আর সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় এই শাসন চলছে বলে কেউ কিছু বলতেও পারছে না।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি বলছেন অপরাধ দমন করা যায় না, শুধু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এই স্বীকারোক্তিটাই যথেষ্ট বোঝার জন্য যে দেশটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনুস আর ওয়াকারের এই জোট যতদিন থাকবে, ততদিন রাজশাহীর মানুষকে রাত জেগে পাহারা দিতে হবে, আর দেশের বাকি অংশও ধীরে ধীরে একই পথে এগোবে। যে শাসন অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে আইনশৃঙ্খলা কখনো সুস্থির হতে পারে না।

