চারঘাটের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখন মাদকসেবীদের আড্ডাখানা। দরজা নেই, জানালা নেই, এমনকি টয়লেটের দরজাও খুলে নিয়ে গেছে কেউ। ছয় কোটি টাকা খরচ করে বানানো এই জাদুঘর এখন একটা খোলা গোয়ালঘরের চেয়ে বেশি কিছু নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কি শুধুই লুটপাট? নাকি এর পেছনে আছে সুচিন্তিত একটা পরিকল্পনা?
পাঁচ আগস্টের পর যা হয়েছে, তা দেখলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, জাদুঘর একযোগে আক্রমণের শিকার হয়েছে। এটা কোনো উচ্ছৃঙ্খল জনতার কাজ নয়। এটা সংগঠিত, পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যমূলক। যারা একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, যাদের হাতে রক্ত মাখা আছে এই দেশের লাখো শহীদের, তারা এখন ক্ষমতার অংশীদার। আর তাদের প্রথম কাজটাই হচ্ছে সেই ইতিহাস মুছে ফেলা, যে ইতিহাস তাদের অপরাধের সাক্ষী।
ইউনূসের তথাকথিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছে। কিন্তু চারঘাটের জাদুঘর সংস্কারের জন্য এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি। এটা কি অবহেলা? নাকি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা? যে সরকারের মন্ত্রিসভায় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক আর তাদের দোসররা বসে আছে, সেই সরকার কেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় আগ্রহী হবে? তাদের কাছে তো এটাই বরং সুবিধার যে এসব স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাক, বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যাক।
চারঘাটের সেই নির্মম দিনটার কথা ভাবুন। আটশোরও বেশি মানুষ, সাধারণ গ্রামবাসী, যাদের অপরাধ ছিল শুধু এই যে তারা বাঙালি। পদ্মা পার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু নদীর তীরে মেশিনগান বসিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় তাদের। লাশগুলো পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে কোনো চিহ্ন না থাকে। পুরো এলাকা পরিণত হয় পুরুষশূন্য বিধবা গ্রামে। এই ভয়াবহতা মনে রাখার জন্যই তো জাদুঘর। কিন্তু এখন সেই জাদুঘরই নেই।
জামায়াতে ইসলামী আর তাদের সহযোগীরা জানে, ইতিহাস থাকলে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম যদি জানতে পারে একাত্তরে কারা কোন পক্ষে ছিল, কারা রাজাকার ছিল, কারা আলবদর ছিল, তাহলে তো আর তাদের সাদা কাপড় পরিয়ে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই প্রথম কাজ হচ্ছে সেই স্মৃতিগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। জাদুঘর লুট করা, ভাস্কর্য ভাঙা, স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করা। আর এসবের পেছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের একটা অংশের নীরব সমর্থন তো আছেই।
যে দেশে সেনাবাহিনীর সমর্থনে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে একটা সরকার বসানো হয়, যেখানে জুলাই মাসে পরিকল্পিত দাঙ্গা বাধিয়ে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়, সেখানে আর কোনো নিয়মকানুনের মূল্য থাকে না। বিদেশি অর্থায়ন আর ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় যে ক্যু সফল হয়েছে, সেই ক্যুর নায়করা এখন ক্ষমতায়। আর তারা যা করছে তা পুরোপুরি প্রত্যাশিত। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দিতে চায়, কারণ সেই ইতিহাসই তাদের আসল চেহারা উন্মোচন করে।
চারঘাটের মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলী বলেছেন, এক বছরের বেশি সময় হলেও জাদুঘর সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। উপজেলা প্রশাসন ক্ষতির তালিকা পাঠিয়েছে, কিন্তু বরাদ্দ আসেনি। কেন আসবে? যাদের রাজনৈতিক দর্শনই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, তারা কেন টাকা দেবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায়? এটা তাদের কাছে অগ্রাধিকার নয়, বরং সমস্যা।
সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হলো, যে জায়গাটা ছিল পবিত্র স্মৃতির আধার, সেখানে এখন মাদকসেবীরা আড্ডা দেয়। এটা কি শুধুই দুর্ঘটনা? নাকি এটাও একটা প্রতীকী বার্তা যে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখন ঠিক এতটাই মূল্যহীন? ইউনূস আর তার দোসররা নিশ্চয়ই খুশি। কারণ তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে নির্বিঘ্নে। কেউ প্রশ্ন করছে না, কেউ জবাবদিহি চাইছে না।
যুদ্ধাপরাধীদের দল এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার। তারা দেশটাকে আবার সেই পাকিস্তানি ভাবাদর্শের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যেখানে বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলা ভাষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবকিছুই হবে অবাঞ্ছিত। চারঘাটের জাদুঘর ধ্বংস তাই শুধু একটা ঘটনা নয়, এটা একটা বড় প্রকল্পের ছোট্ট অংশ। আর সেই প্রকল্পের নাম হলো ইতিহাস বিকৃতি।
যারা ভেবেছিল পাঁচ আগস্টে একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তারা এখন বুঝতে পারছে আসলে কী হয়েছিল। একটা সুপরিকল্পিত ক্যু হয়েছিল, যার পেছনে ছিল বিদেশি শক্তি, জঙ্গি সংগঠন আর সেনাবাহিনীর একটা অংশের সমর্থন। আর সেই ক্যুর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটাকে আবার পঁচাত্তরের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ হবে একটা বিতর্কিত বিষয়, যেখানে যুদ্ধাপরাধীরা হবে সম্মানিত নাগরিক।
চারঘাটের জাদুঘর হয়তো কখনো সংস্কার হবে না। হয়তো এভাবেই পড়ে থাকবে ধ্বংসস্তূপ হয়ে। কারণ যারা এখন ক্ষমতায়, তাদের কাছে এই ধ্বংসই কাঙ্ক্ষিত। ইউনূস আর তার সহযোগীরা জানে, ইতিহাস থাকলে তাদের মুখোশ খুলে যাবে। তাই ইতিহাস মুছে ফেলাটাই তাদের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা বেশ সফলই বলতে হবে।

