দেশে এখন আইনের শাসন বলে কিছু নেই। আছে জঙ্গলের শাসন। গত দশ মাসে মব সন্ত্রাসে ১৪০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি সরাসরি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত দাঙ্গা এবং তারপর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের ফলাফল। যে ইউনুস সরকার বিদেশি অর্থায়ন, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তা এবং সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের শাসনে এমন নৈরাজ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। মানুষ এখন নিজেই বিচারক, নিজেই জল্লাদ। কোনো অভিযোগ উঠলেই ভিড় জড়ো হয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। চোর সন্দেহ, ডাকাত সন্দেহ, ছিনতাইকারী সন্দেহ, ছেলেধরা সন্দেহ, সাবেক সরকারের সমর্থক সন্দেহ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এসব নানান অজুহাতে চলছে এই হত্যাযজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম, সর্বত্র একই চিত্র। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, আর জনতা মানুষ পিটিয়ে মারছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র দশ মাসে ২৫৬টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৪০ জন নিহত এবং ২৩১ জন আহত হয়েছে। এই সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৩ সালে এ ধরনের ঘটনায় মারা গিয়েছিল ৫১ জন, ২০২৪ সালে ১২৮ জন। কিন্তু ২০২৫ সালে মাত্র দশ মাসেই সেই সংখ্যা ১৪০ ছাড়িয়ে গেছে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরের হিসাব তো এখনো বাকি। এটা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে অবৈধ সরকারের শাসনামলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে।
ইউনুসের তথাকথিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুলিশ বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পুলিশ এখন দায়িত্ব পালন করতে ভয় পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করছে, কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। কারণটা খুবই পরিষ্কার। যে দাঙ্গার মাধ্যমে এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই দাঙ্গায় পুলিশকেই প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পুলিশ সদস্যদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের পরিবারকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। এখন সেই পুলিশকেই আবার দায়িত্ব পালন করতে বলা হচ্ছে, কিন্তু তাদের পিছনে কোনো রাজনৈতিক সমর্থন নেই, নেই কোনো সুরক্ষা।
দেশে এখন কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। পুরো দেশ চলছে একটি অবৈধ কাঠামোর অধীনে যার কোনো জনসমর্থন নেই, নেই কোনো গণতান্ত্রিক বৈধতা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম সঠিকভাবেই বলেছেন, পুলিশের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে কি না সন্দেহ। এই সুযোগে স্বার্থান্বেষী মহল মব সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। যখন সরকারপ্রধান নিজেই কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সরকার বলে পরিচিত হন, তখন সেই গোষ্ঠীর লোকজন মব সন্ত্রাস করতেও ভয় পায় না।
গত বারো বছরে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছে এক হাজার ১৩ জন মানুষ। এটা একটা ভয়াবহ সংখ্যা। কিন্তু যেটা আরও ভয়াবহ তা হলো, এই হত্যাকাণ্ডগুলোতে কদাচিৎ বিচার হয়। হত্যা মামলা হয়, কিন্তু শাস্তি হয় না। অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ২০১৯ সালে বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেণু নামের এক নারীকে গণপিটুনিতে মারার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পরও সেই হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। এটাই হলো বাস্তবতা। অপরাধীরা জানে যে তাদের কিছু হবে না, তাই তারা নির্দ্বিধায় হত্যা করে যাচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেছেন, এ ধরনের অনভিপ্রেত সহিংসতা মানুষের চিন্তাজগতকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়, মনে চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশুদের মনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি। একটা প্রজন্ম বড় হচ্ছে এই সহিংসতা দেখে দেখে। তারা শিখছে যে আইনের চেয়ে জনতার রায়ই বড়, যে কোনো সমস্যার সমাধান হলো পিটিয়ে মেরে ফেলা। এই প্রজন্ম যখন বড় হবে, তখন দেশের অবস্থা কী হবে সেটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পরে সাধারণত মব সন্ত্রাসের হার বেড়ে যায়। ২০১৩-১৫ সালে এবং ২০২৩-২৪ সালে এই প্রবণতা স্পষ্ট। কিন্তু ২০২৫ সালে যেভাবে এই সংখ্যা বেড়েছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এটা শুধু নির্বাচনী সহিংসতা নয়, এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সম্পূর্ণ ভাঙন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যদি কোনো নির্বাচন হয়ও, তার আগ পর্যন্ত এই অবস্থা আরও খারাপ হবে বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম সঠিকভাবেই বলেছেন যে, মব সন্ত্রাস দূর করতে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। কিন্তু সমস্যা হলো, যে সরকার নিজেই দাঙ্গা-হাঙ্গামার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের কি আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনো সদিচ্ছা থাকতে পারে? যে সরকার জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছে, তারা কীভাবে জনগণের নিরাপত্তা দেবে? যে সরকারের কোনো গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই, তারা কীভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে?
বাস্তবতা হলো, ইউনুস সরকারের অধীনে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আর কোনো উন্নতি হবে না। বরং দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হবে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই এখন মব সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে। গোপালগঞ্জের শামিম মিয়া হোক কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শামীম আহমেদ, সবার ভাগ্যে জুটছে একই পরিণতি। পুলিশ অসহায়, প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, আর সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
যারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের শাসনে দেশের এই অবস্থাই হওয়ার কথা ছিল। বিদেশি অর্থায়নে যারা দাঙ্গা বাঁধিয়েছে, তারা কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে? যারা নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক সমর্থন নিয়েছে, তারা কীভাবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন রাস্তার প্রতিটি মৃতদেহের মধ্যে লেখা আছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলার এই বিপর্যয়ের দায় সম্পূর্ণভাবে ইউনুস এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের। এই অবৈধ শাসনের প্রতিটি দিন দেশকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

