বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এক গভীর কালো দাগ হয়ে থাকবে— সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড। এই রায় কেবল বিতর্কিত নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রতিটি মৌলিক নীতি, প্রতিটি সাংবিধানিক বিধান এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার সরাসরি অবমাননা।
রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছে যেন এটি কোনো আদালতের রায় নয়, বরং একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক প্রদর্শনী। প্রশ্ন উঠতেই পারে—বিচার কি সত্যিই হয়েছে, নাকি বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করা হয়েছে?
সংবিধান বহির্ভূত অধ্যাদেশ, রাষ্ট্রক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার
অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের চার দফা ICT আইন সংশোধন ছিল ক্ষমতার স্পষ্ট সীমালঙ্ঘন। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ এমন সংশোধনের কোনো অনুমতি দেয় না—বিশেষ করে সংসদ যখন অকার্যকর এবং জনগণের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত। এইসব অধ্যাদেশ এক ধরনের “আইনের মুখোশ”—অবৈধ নথিকে বৈধতার ছদ্মবেশ দেওয়ার দুর্বল প্রচেষ্টা। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংবিধানবিরোধী আইন শূন্য, বাতিল এবং অকার্যকর।
সুতরাং, এই অবৈধ অধ্যাদেশে দাঁড়ানো ICT-র ভিত্তি আইনগতভাবে টেকেনি। ভিত্তিহীন কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো রায় কখনোই বৈধতা দাবি করতে পারে না। এটি কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটি নয়—এটি রাষ্ট্রের মূল আইনি কাঠামোর প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
ICTA বলে দেয়—কেবল হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকরাই ICT-এর বিচারক হতে পারেন। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে অতিরিক্ত বিচারক, যারা এখনো পরীক্ষামূলক অবস্থায়, যাদের স্থায়ী নিয়োগ নিশ্চিত নয় এবং যারা সংবিধানপ্রদত্ত বিচারিক নিরাপত্তা ভোগ করেন না।
এটি বিচারকের অযোগ্যতা নয়—এটি আইনকে অস্বীকার করে যোগ্যতা-বহির্ভূত ব্যক্তিকে ক্ষমতা দেওয়ার দৃষ্টান্ত। যে বিচারক আইনগতভাবেই যোগ্য নন, তার মাধ্যমে প্রদত্ত রায় নিজেই প্রশ্নাতীতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি বিচারকে অপবিত্র করে, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকে আঘাত করে এবং জনগণের আস্থা ভেঙে দেয়।
বিচারকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার স্পষ্ট নকশা
ট্রাইব্যুনালের পুনর্গঠিত কাঠামো, অবৈধ অধ্যাদেশ, অযোগ্য বিচারক এবং দ্রুতগতির বিচারপ্রক্রিয়া—সবকিছুই ইঙ্গিত করে যে এই ট্রাইব্যুনালের লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ। যে আদালতে প্রক্রিয়া নেই, যোগ্য বিচারক নেই, সংবিধান-সম্মত ভিত্তি নেই—সেই আদালতের রায় কেবলমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার রাজনৈতিক একচেটিয়াকরণ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড ঘোষণায় যে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন এই বিচার সেই ন্যূনতম মানদণ্ডও স্পর্শ করেনি। এটি বিচার নয়; এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আইনি আবরণ।
এই রায় ইতিহাস ও আইনের পরীক্ষায় টিকবে না
বাংলাদেশের সংবিধানবিরোধী কোনো আদালতের দেওয়া রায় রাষ্ট্রের সামনে কখনোই টেকসই ভিত্তি তৈরি করতে পারে না। শেখ হাসিনার রায় সংবিধান, আইন এবং অপারগ বিচারব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে—এমন রায় ইতিহাসে টিকে থাকার কোনো সুযোগই পায় না।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয় আইনের ওপর, সংবিধানের ওপর, জনগণের অনুমোদনের ওপর—অবৈধ তৎপরতার ওপর নয়। আইন ভেঙে বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না; এমন বিচার কেবল রাষ্ট্রকে দুর্বল করে, বিচারব্যবস্থায় অস্থিরতা আনে এবং জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ এমন প্রহসনমূলক বিচার গ্রহণ করবে না আর ইতিহাস এমন রায়কে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করবে।

