বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ সংকট হলো—জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আদৌ বৈধ থাকবে কি না। ইউনুস নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে বহু সংবিধানবিদ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সরাসরি “সাংবিধানিক ভিত্তিহীন সরকার” হিসেবে উল্লেখ করছেন। কারণ এই প্রশাসনের নেই কোনো জনসমর্থন, নেই নির্বাচনী ম্যান্ডেট, নেই সংবিধানসম্মত স্থায়ী শাসনক্ষমতার পরিধি। ফলে তাদের নেওয়া যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক, কৌশলগত বা প্রশাসনিক—শুরু থেকেই বৈধতা সংকটে দাঁড়িয়ে আছে।
এই অবৈধতার ছায়া সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করার অদ্ভুত ও তড়িঘড়ি প্রচেষ্টায়। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তি, প্রশাসনিক নিয়োগ থেকে পদোন্নতি—সবকিছুতেই রাজনৈতিক প্রতিশোধের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বৈধ নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তকে একতরফাভাবে বাতিল করা কেবল রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা বাড়ায় না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে, দেশকে “নীতিহীন” ও “অস্থিতিশীল” হিসেবে তুলে ধরে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করেন একটি দেশের নীতির ধারাবাহিকতা—আর ঠিক সেই ধারাবাহিকতাই আজ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হলো—বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কৌশলগত স্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পদের ইজারা চুক্তি। একটি অনির্বাচিত ও বৈধতাহীন সরকারের পক্ষে এ ধরনের উচ্চ-ঝুঁকির রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুধু নৈতিক দায় এড়ানো নয়, বরং সরাসরি আইনি জটিলতা তৈরি করা। বৈধ সরকার ক্ষমতায় ফিরলে এ ধরনের ইজারা বা কৌশলগত চুক্তিগুলো সহজেই বাতিলযোগ্য, অকার্যকর কিংবা পুনর্মূল্যায়নযোগ্য হয়ে পড়বে—এটি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও স্বীকৃত। বৈধতা ছাড়া স্বাক্ষরিত রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতিকে অনেক দেশই binding commitment হিসেবে মানে না।
একইভাবে প্রশাসনে যে নিয়োগ, পুনর্বিন্যাস এবং পদোন্নতি বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। কারণ এগুলোর অনুমোদন দিচ্ছেন এমন একজন প্রধান নির্বাহী, যার নিজস্ব বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার চাইলে এসব সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করতে বা বাতিল করতে সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে। এটি প্রশাসনের ভেতরে আতঙ্ক, অস্থিরতা এবং আস্থাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে—রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাস্তবতা স্পষ্ট ও নির্মম একটি বৈধতাহীন সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত কখনোই রাষ্ট্রের স্থায়ী নীতি হয়ে দাঁড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং উন্নয়ন ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে একমাত্র প্রয়োজন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বৈধ সরকার। কিন্তু ইউনুস সরকারের তাড়াহুড়ো করে নেওয়া চুক্তি, ইজারা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে, বিদেশনীতিতে বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং ভবিষ্যৎ সরকারকে অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এই অবৈধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা যতদিন চলবে, ততদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে—এবং এর দায় সম্পূর্ণভাবে বর্তমান অবৈধ সরকারের ওপরই বর্তাবে।

