পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা না দিলে পায়ে গুলি। এক কোটি টাকা না দিলে পরিবারকে হত্যার হুমকি। দোকানদারের কাছে দৈনিক পাঁচশ টাকা আদায়। ট্রাক চালকের কাছে পথে পথে চাঁদা। এই হলো ইউনুস-বিএনপি-জামাতের ‘নতুন বাংলাদেশ’। যে দেশের স্বপ্ন দেখিয়ে জুলাইয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই দেশে এখন চাঁদাবাজি মহামারির চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই মহামারির জীবাণু ছড়াচ্ছে বিএনপি-জামাতের রাজনৈতিক ক্যাডাররা, যারা এখন প্রকাশ্যে দিনদুপুরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে।
ষোলো বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। সেই সময়ে দেশের অর্থনীতি বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, রপ্তানি আয় তিনগুণ হয়েছে। বিএনপি-জামাত তখন বলত আওয়ামী লীগ নাকি চাঁদাবাজি করে। কিন্তু সেই ষোলো বছরে চট্টগ্রাম চেম্বারের কোনো পরিচালকের কাছে কি কেউ এক কোটি টাকা চাঁদা চেয়েছিল? পল্লবীর কোনো ব্যবসায়ীর পায়ে কি গুলি করা হয়েছিল? খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারকে কি চাঁদা দিতে হয়েছিল? উত্তর হলো না। কারণ তখন রাষ্ট্রযন্ত্র সক্রিয় ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ছিল, আর যারা চাঁদাবাজি করত তারা ক্ষমতায় ছিল না।
এখন যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা আসলে কারা? বিএনপি-জামাত জোট, যাদের ইতিহাস পুরোটাই সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির। খালেদা জিয়ার আমলে হাওয়া ভবন ছিল চাঁদাবাজির সদরদপ্তর। তারেক রহমানের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায়ের খবর তো সবারই জানা। তারেক রহমানের আরেক নাম “চান্দা তারেক” হয়ে যায় তখন থেকেই। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশে সন্ত্রাসীদের স্বর্গযুগ ছিল। তখন বাংলা ভাই আর শায়খ আবদুর রহমানের জঙ্গিরা খোলাখুলি বোমা মেরে মানুষ হত্যা করত। পুলিশ তাদের ধরতে যেত না, কারণ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।
ইউনুস কে? একজন সুদখোর মহাজন, যিনি গরিব মানুষের ঘাড়ে সুদের বোঝা চাপিয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। তার গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে বিতর্ক দশকের পর দশক ধরে চলছে। দরিদ্র নারীদের কাছ থেকে যে হারে সুদ নেওয়া হয়েছে, তা যেকোনো মহাজনকেও লজ্জা দেবে। এই লোকটাই এখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা, যিনি নিজেকে দেশের ত্রাণকর্তা হিসেবে জাহির করছেন। অথচ তার তত্ত্বাবধানে দেশে চাঁদাবাজির যে প্রকোপ শুরু হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
পুলিশের তালিকা বলছে রাজধানীতে আড়াই হাজারের বেশি চাঁদাবাজ সক্রিয়। সারা দেশে অর্ধলক্ষাধিক। এদের বেশিরভাগই নতুন, আর এদের প্রায় সবারই রাজনৈতিক পরিচয় আছে। কোন দলের? বিএনপি-জামাত। পুলিশ যখন বলছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা চাঁদাবাজিতে জড়িত, তখন কার কথা বলা হচ্ছে? আওয়ামী লীগ তো নিষিদ্ধ, তাদের নেতাকর্মীরা তো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাহলে রাস্তায় কারা চাঁদা আদায় করছে? উত্তর স্পষ্ট। বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীরা।
শুধু পরিবহন খাত থেকেই ঢাকায় দৈনিক আড়াই কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। মাসে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি। এই টাকা যাচ্ছে কোথায়? রাজনৈতিক দলের পকেটে। এই অর্থনীতিকে বলে ক্রিমিনাল ইকোনমি, যা শাসনব্যবস্থার অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। ইউনুসের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ নিজেই স্বীকার করেছেন, চাঁদাবাজির সমঝোতা খুব সহজ। একটা চক্র গেলে আরেকটা চক্র আসে। তার মানে এই সরকার জানে চাঁদাবাজি চলছে, কিন্তু আটকাতে পারছে না। কেন পারছে না? কারণ যারা চাঁদাবাজি করছে, তারাই তো এই সরকারের ভিত্তি।
বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করেছে। তারা বলছে গাড়ি বিক্রয়কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটছে, চাঁদা না দিলে হুমকি আসছে। অথচ পুলিশে জিডি করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে না। কেন? কারণ যারা এসব করছে, তাদের পিঠে হাত রেখেছে ক্ষমতাসীনরা।
চট্টগ্রামের নারী উদ্যোক্তার কাছে সাজ্জাদ আলী নামের শীর্ষ সন্ত্রাসী এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছে। না দিলে পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এই সাজ্জাদ আলী কে? কোন দলের লোক? কার মদদে এত সাহস পাচ্ছে সে? উত্তর জানা আছে সবার। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক বলছেন আট মাস ধরে তার চরিত্র হনন করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কারণ তিনি চাঁদা দিতে রাজি হননি। একজন রপ্তানিকারক, যিনি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাকে চরিত্র হনন করা হচ্ছে চাঁদা না দেওয়ার অপরাধে। এই হলো ইউনুসের শাসনব্যবস্থা।
আরো মজার বিষয় হলো, বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পুত্রবধূকেও চাঁদা দিতে হচ্ছে। তিনি থানায় জিডি করেছেন। মানে বিএনপির নিজের লোকজনও এখন নিরাপদ নয়। কারণ চাঁদাবাজিতে এখন আর শৃঙ্খলা নেই। যে যেভাবে পারছে, সে সেভাবে টাকা আদায় করছে। বিএনপির নামে, জামাতের নামে, বড় নেতাদের নাম ভাঙিয়ে সবাই চাঁদা আদায় করছে। আর এর সুবিধা নিচ্ছে জঙ্গি সংগঠনগুলোও। জুলাই দাঙ্গায় যেসব জঙ্গি মুক্ত হয়েছে, তারা এখন চাঁদাবাজিতে নেমেছে। এই টাকা দিয়ে তারা আবার সংগঠন গড়ছে, অস্ত্র কিনছে।
জুলাই দাঙ্গায় যে তান্ডব হয়েছিল, তার পেছনে বিদেশি অর্থায়ন ছিল। এটা এখন সবাই জানে। কোন দেশের, কোন সংস্থার টাকা এসেছিল, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ইউনুস সরকার কি তদন্ত করেছে? না। কারণ তদন্ত করলে তো তাদের নিজেদের ভূমিকা বেরিয়ে আসবে। বিদেশি শক্তি যে একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করার জন্য টাকা ঢেলেছিল, সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে। আর সেই টাকায় বিএনপি-জামাত জোট ছাত্র-জনতার নামে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়েছিল রাস্তায়। সেই সন্ত্রাসীরাই এখন চাঁদাবাজ।
গত চৌদ্দ মাসে চাঁদাবাজির ঘটনায় শতাধিক মানুষ খুন হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই কুড়ি জন। এটা কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটা একটা সুসংগঠিত ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক, যার শিকড় রাজনীতি আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে। ডিএমপি কমিশনার বলছেন চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করছেন। কিন্তু শুধু তালিকা তৈরি করলে হবে? গ্রেপ্তার কই? শাস্তি কই?
ইউনুস সরকার আসলে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চায় না। কারণ যারা চাঁদাবাজি করছে, তারাই তো তাদের ক্ষমতার ভিত্তি। বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীরা যদি চাঁদাবাজি বন্ধ করে, তাহলে তাদের আয় বন্ধ হবে। আর তাদের আয় বন্ধ হলে দলের তহবিল শূন্য হবে। তহবিল শূন্য হলে রাজনীতি চলবে কীভাবে? তাই ইউনুস সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করবে না। করতে পারবেও না। কারণ এই চাঁদাবাজিই তাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির ভিত্তি।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সেই বক্তব্যটা আবারও মনে করা যাক। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন, কিন্তু চাঁদাবাজির সমঝোতা সহজ। এর মানে কী? এর মানে হলো, ইউনুস সরকার জানে যে চাঁদাবাজি একটা স্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা চক্র যায়, আরেকটা চক্র আসে। এই চক্র পরিবর্তন হলেও পদ্ধতি একই থাকে। আর সেই পদ্ধতিতে সরকারেরও একটা অংশীদারিত্ব আছে। নইলে অর্থ উপদেষ্টা এত নির্লিপ্ত হয়ে কীভাবে বলতে পারেন যে চাঁদাবাজির সমঝোতা সহজ?
এখন প্রশ্ন হলো, এই চাঁদাবাজি বন্ধ হবে কীভাবে? উত্তর সহজ। যতদিন বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন চাঁদাবাজি চলবে। কারণ চাঁদাবাজিই তাদের রাজনীতির মূল। তারা ক্ষমতায় এসেছে দাঙ্গা করে, খুন করে, সন্ত্রাস করে। এখন তারা ক্ষমতায় টিকে থাকবে সেই একই পদ্ধতিতে। চাঁদাবাজি, খুন, সন্ত্রাস। এটাই তাদের রাজনীতির ভাষা। আর ইউনুস? তিনি তো শুধু একটা মুখোশ। আসল খেলা চলছে বিএনপি-জামাতের হাতে।
দেশে এখন আইনের শাসন নেই। পুলিশ অকার্যকর। প্রশাসন অচল। রাজনৈতিক ক্যাডাররা আইনের ঊর্ধ্বে। আর সাধারণ মানুষ চরম অনিশ্চয়তায়। ব্যবসায়ীরা ভয়ে দোকান বন্ধ করছে। পরিবহন মালিকরা গাড়ি চালাতে পারছে না। শ্রমিকরা কাজ হারাচ্ছে। অর্থনীতি ধসে পড়ছে। আর এই সবকিছুর জন্য দায়ী ইউনুস-বিএনপি-জামাত জোট। যারা গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই এখন দেশকে একটা অরাজক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

