দেড় বছর কেটে গেছে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় কর্মরত চার পুলিশ সদস্যের পরিবারগুলো এখনো অপেক্ষায় আছে। কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। কেউ জিজ্ঞেস করেনি, তাদের সন্তান, তাদের স্বামী, তাদের ভাই যারা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের পরিবার এখন কেমন আছে। রইজ উদ্দিন খান, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, আরিফুল আজম আর রিয়াজুল ইসলাম। এই চারটি নাম আজ শুধুই স্মৃতি। তাদের পরিবারের কাছে অসহনীয় বেদনার উৎস, আর রাষ্ট্রের কাছে সম্ভবত অপ্রয়োজনীয় এক পরিসংখ্যান।
এটাই কি সেই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল? যেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, আর তারপর তাদের পরিবারের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে সব দায়িত্ব শেষ? যে সরকার এই আন্দোলনের নামে ক্ষমতায় এসেছে, যারা প্রতিদিন গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর মানবাধিকারের কথা বলেন, তারাই কেন এই চার পরিবারের কাছে নীরব?
মুহাম্দ ইউনুস এবং তার নেতৃত্বাধীন এই অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিদিন বড় বড় কথা বলে। সংস্কারের কথা বলে। ন্যায়বিচারের কথা বলে। কিন্তু যে চার পুলিশ সদস্যকে জনতা পিটিয়ে হত্যা করেছিল, তাদের বিচার কোথায়? তাদের পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান কোথায়? নাকি পুলিশ সদস্য হওয়ার অপরাধে তারা এই সম্মান পাওয়ার অযোগ্য?
যে কোনো সভ্য দেশে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে নিহত সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্র স্মরণ করে, সম্মান করে। তাদের পরিবারকে দেখভাল করার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটেছিল, তা আসলে কোনো আন্দোলন ছিল না। সেটা ছিল সুপরিকল্পিত একটি অভ্যুত্থান। একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার সুচিন্তিত প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের মধ্যে এই চার পুলিশ সদস্যও ছিলেন।
এই চার পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোথায় গেছে, তা সবাই দেখছেন। পুলিশ বাহিনী আজ মনোবল হারিয়েছে। তারা জানেন না, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছু হলে তাদের পরিবারের দেখভাল কে করবে। রাষ্ট্র কি পাশে দাঁড়াবে, নাকি কিছু টাকা দিয়ে দায় সেরে ফেলবে? এই অনিশ্চয়তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
আর সেনাপ্রধান ওয়াকার? যিনি এই অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তার কাছে প্রত্যাশা থাকে যে তিনি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি কি সেই দায়িত্ব পালন করছেন? নাকি একটি অবৈধ ক্ষমতা দখলের বৈধতা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছিল, সেটা যদি সত্যিই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হতো, তাহলে এত সুসংগঠিত ভাবে একযোগে সারাদেশে সরকারি স্থাপনায় হামলা হতো কীভাবে? থানায় আগুন দেওয়া হতো কীভাবে? পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করে হত্যা করা হতো কীভাবে? এসবের পেছনে পরিকল্পনা ছিল। অর্থায়ন ছিল। সমন্বয় ছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থন ছিল।
আজকে যারা ক্ষমতায়, তারা প্রতিদিন পুরনো সরকারের সমালোচনা করেন। ফ্যাসিবাদের কথা বলেন। কিন্তু তারা নিজেরা কি করছেন? একটি নির্বাচিত সরকারকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া, দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা, এগুলো কি গণতন্ত্রের লক্ষণ? নাকি এগুলোই আসলে প্রকৃত ফ্যাসিবাদ?
যে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলো এই তথাকথিত আন্দোলনে সহায়তা করেছিল, তারা আজ কোথায়? তারা কি সত্যিই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল, নাকি তাদের নিজস্ব এজেন্ডা ছিল? আর যে বিদেশি অর্থায়নের কথা শোনা যায়, সেগুলোর হিসাব কে দেবে?
সুজানগরের এই চার পুলিশ সদস্যের পরিবার আজ নিঃসঙ্গ। কেউ তাদের খবর রাখে না। এমনকি যে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হয়ে তারা কাজ করতেন, সেখান থেকেও কেউ আসে না। কারণ পুলিশ বিভাগও আজ অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তারা জানে না, তাদের অস্তিত্ব এই সরকার চায় কি না।
রইজ উদ্দিন খানের পরিবার, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাসের পরিবার, আরিফুল আজমের পরিবার আর রিয়াজুল ইসলামের পরিবার কি চায়? তারা চায় বিচার। তারা চায় তাদের প্রিয়জনদের হত্যাকারীদের শাস্তি। তারা চায় রাষ্ট্র স্বীকার করুক যে তাদের স্বামী, সন্তান, ভাই রাষ্ট্রের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।
কিন্তু মুহাম্মদ ইউনুস আর তার সরকার এই বিচার দেবে না। কারণ এই বিচার দিলে তাদের ক্ষমতায় আসার পুরো ন্যারেটিভটাই ভেঙে পড়বে। তখন প্রশ্ন উঠবে, আসলে কী হয়েছিল জুলাইয়ে। কারা পরিকল্পনা করেছিল। কাদের স্বার্থ ছিল একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দিতে।
এই চার পুলিশ সদস্যের মৃত্যু শুধু চারটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটা একটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। এটা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে আইনের শাসন বলে আজ আর কিছু নেই। যদি থাকতো, তাহলে দায়িত্বরত সরকারি কর্মচারীদের হত্যাকারীদের বিচার হতো। তাদের পরিবার ন্যায়বিচার পেতো।
কিন্তু ন্যায়বিচার তো দূরের কথা, এই পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নেওয়ারও কেউ নেই। কারণ যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা এসেছে পুলিশকে মেরে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে, দেশের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে। তারা কীভাবে সেই পুলিশ সদস্যদের পরিবারের খোঁজ নেবে যাদের মৃত্যু তাদের ক্ষমতায় আসার সিঁড়ি?
ইউনুস আর ওয়াকারের কাছে হয়তো এই চার পরিবারের কান্না শোনা যায় না। রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চাসন থেকে হয়তো সুজানগর অনেক দূরে। কিন্তু ইতিহাস সব মনে রাখে। ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবে কীভাবে একটি অবৈধ সরকার ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে নিহতদের পরিবারকে অবহেলা করেছে। কীভাবে হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রইজ উদ্দিন খান, প্রনবেশ কুমার বিশ্বাস, আরিফুল আজম আর রিয়াজুল ইসলাম। এই চার নাম হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে গুরুত্বহীন। কিন্তু যারা সত্যিকারের ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে, তাদের কাছে এই চার নাম প্রশ্ন হয়ে থাকবে। প্রশ্ন থাকবে, এই দেশে কি আইনের শাসন আছে? নাকি শুধু ক্ষমতার খেলা?

