Monday, December 1, 2025

স্বাধীন গণমাধ্যমের মিথ, মেঘনায় ভাসা সাংবাদিকের লাশ আর ইউনুসের বাংলাদেশ

বিভু রঞ্জন সরকারের শেষ চিঠিটা পড়লে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। একজন একাত্তর বছরের মানুষ, সারাজীবন কলম ধরে থাকা একজন সাংবাদিক, মৃত্যুর আগের দিন লিখে গেছেন তার ভয়ের কথা, অস্থিরতার কথা, সেই অশুভ ডাকের কথা যা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। পরদিন মেঘনা থেকে তুলে আনা হয় তার মৃতদেহ। এটা আসলে সেই বাংলাদেশের চেহারা যেটা তৈরি হয়েছে গত দেড় বছরে, মুহাম্মদ ইউনুস আর তার তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে।

২০২৪ সালের আগস্টে যখন একটা নির্বাচিত সরকারকে জুলাইয়ের দাঙ্গার আগুনে পুড়িয়ে উৎখাত করা হলো, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন নতুন কিছু হবে। কিন্তু কী হলো? একটা দেশ পুরোপুরি ধসে গেল। আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু রইলো না, সাংবাদিকতা বলে কিছু রইলো না, মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু রইলো না। যে মানুষটা নোবেল পুরস্কার পাওয়া, যাকে নিয়ে একসময় এত গর্ব ছিল, সেই মানুষটাই দেশকে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দিলেন যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।

সাংবাদিকদের অবস্থা দেখলেই সব বোঝা যায়। আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো রাস্তার মাঝখানে। আনোয়ার হোসেন সোরভকে পুলিশের সামনেই মারধর করা হলো। হেলাল হোসেন কবিরকে তার মায়ের সাথে একসাথে পেটানো হলো। বাহার রাইহানের পায়ে ছুরি মারা হলো। আর শাহ আলম খন্দকারকে তো একেবারে খুন করেই ফেলা হলো। এগুলো কি সভ্য সমাজের লক্ষণ? এগুলো কি গণতন্ত্রের লক্ষণ? নাকি এটাই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ যেটা তৈরি করতে চেয়েছিলেন ইউনুস আর তার দল?

শুধু হত্যা আর মারধর নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজকে এমনভাবে ভয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে যে কেউ আর খোলাখুলি কথা বলতে পারছেন না। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলছে, শুধু জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসে ২৫৭ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। ১৫২টা হামলা হয়েছে। ১১১ জন আহত হয়েছেন। আর মামলা? ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। হত্যার মামলা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এটা কি সেই সমালোচনার স্বাধীনতা যার কথা বলতেন প্রধান উপদেষ্টা? তার প্রেস উইং থেকে ফোন আসে রিপোর্ট নামাতে বলার জন্য, সংবাদমাধ্যমের নির্বাহীরা ভয়ে কাঁপতে থাকেন যে কখন কী হয়। এটাকে কি বলা যায় মুক্ত সাংবাদিকতা?

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যে মৌলবাদীদের একসময় আইন করে দমন করা হতো, তাদের এখন খোলা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। হিযবুত তাহরীর, হেফাজত ইসলাম, জামায়াত, এসব সংগঠনের লোকজন এখন পুরো দেশে চলাফেরা করছে স্বাধীনভাবে। তারা সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে, ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সংবাদ বন্ধ করতে চাইছে। মাওলানা মাহফুজুল হক খোলাখুলি সরকারকে বলছেন সংবাদমাধ্যম সংস্কার করতে, মানে তাদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলছেন শেখ হাসিনার নাম নিতে গেলে তাকে অপরাধী বলতে হবে, নইলে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র?

এদিকে ইউনুসের সরকার কী করছে? তারা ৩০০ জনেরও বেশি জঙ্গি আর চরমপন্থীকে জামিনে ছেড়ে দিয়েছে। শফিউর রহমান ফারাবি, যে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে আজীবন কারাদণ্ড পেয়েছিল, তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। নাসির উদ্দিন ওরফে শিবির নাসির ২৬ বছর পর মুক্তি পেয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমুদ্দিন রহমানি বেরিয়ে এসেছে। মামুনুল হককে ধর্ষণ মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, এই চরমপন্থীদের ইউনুস তার সরকারে জায়গা দিয়েছেন। হিযবুত তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা নাসিমুল গনি হয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব। মাহফুজ আলম হয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। এ এফ এম খালিদ হোসেন হয়েছেন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা। মানে দেশটা এখন চরমপন্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পুরোপুরি।

ইউনুস আর তার সরকার দাবি করে তারা সংস্কার করছে, তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনছে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? প্রতিদিন পুলিশের অভিযানে শত শত মানুষ ধরা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ কমছে না। সেনাবাহিনী নামিয়ে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না। একদিকে সাংবাদিকদের খুন করা হচ্ছে, আরেকদিকে জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন ধরনের শাসনব্যবস্থা? এটা কোন ধরনের সংস্কার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ৮৫ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখছে। এটা কেন? এটা কি সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর আরেকটা পথ নয়? প্রতিটা বড় পত্রিকা, প্রতিটা টিভি চ্যানেল এখন এই হয়রানির মধ্যে আছে। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, সমকাল, একাত্তর টিভি, কোথাও কোনো রেহাই নেই। আর এসব করা হচ্ছে ইউনুসের নির্দেশে। যে মানুষটা একদিন দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন, সেই মানুষটাই এখন সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছেন, তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন।

যে দেশে একসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হতো, সেই দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের আওয়ামী ট্যাগ দিয়ে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। বিভু রঞ্জন সরকার তার শেষ চিঠিতে এই কষ্টের কথাই লিখে গেছেন। তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ালেও তাকে আওয়ামী বলে গালি দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন দেশ হলো? এটা কি সেই বাংলাদেশ যে দেশের জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছিল? যে দেশের জন্য মা বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

ইউনুস আর তার দল যেভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা ছিল একটা পরিকল্পিত অভ্যুত্থান। জুলাইয়ের দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল সুপরিকল্পিতভাবে। বিদেশি টাকা ঢালা হয়েছিল, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো মাঠে নামানো হয়েছিল, সামরিক বাহিনীর একাংশকে সাথে নেওয়া হয়েছিল। আর তারপর একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হয়েছিল। এটা গণতন্ত্র নয়, এটা একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আর সেই ষড়যন্ত্রের ফলাফল আমরা এখন দেখছি। একটা দেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে।

আজকে বাংলাদেশে কোনো আইনের শাসন নেই। মানুষ রাস্তায় নিরাপদ নয়, ঘরে নিরাপদ নয়। সাংবাদিকরা কলম ধরতে ভয় পায়, মিডিয়া মালিকরা ফোনের অপেক্ষায় থাকেন যে কখন কোন রিপোর্ট নামাতে বলা হবে। জঙ্গিরা খোলাখুলি ঘুরছে, চরমপন্থীরা সরকারে বসে আছে। এটা কোনো দেশ নয়, এটা একটা জঙ্গল হয়ে গেছে। আর এই জঙ্গল তৈরি করেছেন মুহাম্মদ ইউনুস আর তার সরকার।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নতির আশা ছিল কিন্তু সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনো অরক্ষিত। আসলে শুধু অরক্ষিত নয়, অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আগে অন্তত একটা সরকার ছিল, একটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল যারা চেষ্টা করতো কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখতে। এখন সেটাও নেই। এখন যে যার মতো করে চলছে। যার হাতে লাঠি, যার হাতে ছুরি, সেই শক্তিশালী।

বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ নেই। যে দেশটা একদিন উন্নয়নের গল্প শোনাতো, যে দেশের অর্থনীতি এগোচ্ছিল, যে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতো, সেই দেশটা এখন একটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দেড় বছরেই ইউনুস সব ধ্বংস করে ফেলেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিয়েছেন, আইনের শাসন শেষ করে দিয়েছেন, গণতন্ত্রকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মানুষের আশা ভরসাও শেষ করে দিয়েছেন।

সাংবাদিকরা এখনো লড়ে যাচ্ছেন। তারা জানেন হামলা হতে পারে, মামলা হতে পারে, এমনকি খুন হতে পারেন। তবুও তারা লিখছেন, তারা সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কতদিন? কতদিন একটা পেশাজীবী মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবে? কতদিন একটা পরিবার ভয়ে থাকবে যে তাদের স্বামী, তাদের বাবা, তাদের ছেলে কাজে গিয়ে আর ফিরবে কিনা?

বিভু রঞ্জন সরকারের মতো একজন প্রবীণ সাংবাদিক যখন মেঘনা নদীতে ভাসতে থাকেন, তখন বুঝতে হবে দেশটা কতটা গভীর অন্ধকারে চলে গেছে। তিনি জানতেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে, তাই তার শেষ লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে পারেনি। কেউ তাকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ যে সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, সেই সরকারই তার শত্রু হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো ইতিহাসে থাকবেন, কিন্তু একজন মাইক্রোক্রেডিট পথপ্রদর্শক হিসেবে নয়। তিনি থাকবেন একজন মানুষ হিসেবে যিনি তার নিজের দেশকে ধ্বংস করেছেন, যিনি সাংবাদিকতাকে হত্যা করেছেন, যিনি গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছেন, যিনি জঙ্গিদের ক্ষমতা দিয়েছেন। এটাই হবে তার উত্তরাধিকার। আর বাংলাদেশের মানুষ, যারা এখন ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তারা মনে রাখবেন কীভাবে একটা সুন্দর দেশকে নরকে পরিণত করা যায়।

বিভু রঞ্জন সরকারের শেষ চিঠিটা পড়লে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়। একজন একাত্তর বছরের মানুষ, সারাজীবন কলম ধরে থাকা একজন সাংবাদিক, মৃত্যুর আগের দিন লিখে গেছেন তার ভয়ের কথা, অস্থিরতার কথা, সেই অশুভ ডাকের কথা যা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। পরদিন মেঘনা থেকে তুলে আনা হয় তার মৃতদেহ। এটা আসলে সেই বাংলাদেশের চেহারা যেটা তৈরি হয়েছে গত দেড় বছরে, মুহাম্মদ ইউনুস আর তার তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে।

২০২৪ সালের আগস্টে যখন একটা নির্বাচিত সরকারকে জুলাইয়ের দাঙ্গার আগুনে পুড়িয়ে উৎখাত করা হলো, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন নতুন কিছু হবে। কিন্তু কী হলো? একটা দেশ পুরোপুরি ধসে গেল। আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু রইলো না, সাংবাদিকতা বলে কিছু রইলো না, মানুষের নিরাপত্তা বলে কিছু রইলো না। যে মানুষটা নোবেল পুরস্কার পাওয়া, যাকে নিয়ে একসময় এত গর্ব ছিল, সেই মানুষটাই দেশকে এমন এক অন্ধকারে ঠেলে দিলেন যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।

সাংবাদিকদের অবস্থা দেখলেই সব বোঝা যায়। আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো রাস্তার মাঝখানে। আনোয়ার হোসেন সোরভকে পুলিশের সামনেই মারধর করা হলো। হেলাল হোসেন কবিরকে তার মায়ের সাথে একসাথে পেটানো হলো। বাহার রাইহানের পায়ে ছুরি মারা হলো। আর শাহ আলম খন্দকারকে তো একেবারে খুন করেই ফেলা হলো। এগুলো কি সভ্য সমাজের লক্ষণ? এগুলো কি গণতন্ত্রের লক্ষণ? নাকি এটাই সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ যেটা তৈরি করতে চেয়েছিলেন ইউনুস আর তার দল?

শুধু হত্যা আর মারধর নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজকে এমনভাবে ভয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে যে কেউ আর খোলাখুলি কথা বলতে পারছেন না। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বলছে, শুধু জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসে ২৫৭ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। ১৫২টা হামলা হয়েছে। ১১১ জন আহত হয়েছেন। আর মামলা? ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। হত্যার মামলা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এটা কি সেই সমালোচনার স্বাধীনতা যার কথা বলতেন প্রধান উপদেষ্টা? তার প্রেস উইং থেকে ফোন আসে রিপোর্ট নামাতে বলার জন্য, সংবাদমাধ্যমের নির্বাহীরা ভয়ে কাঁপতে থাকেন যে কখন কী হয়। এটাকে কি বলা যায় মুক্ত সাংবাদিকতা?

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যে মৌলবাদীদের একসময় আইন করে দমন করা হতো, তাদের এখন খোলা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। হিযবুত তাহরীর, হেফাজত ইসলাম, জামায়াত, এসব সংগঠনের লোকজন এখন পুরো দেশে চলাফেরা করছে স্বাধীনভাবে। তারা সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে, ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সংবাদ বন্ধ করতে চাইছে। মাওলানা মাহফুজুল হক খোলাখুলি সরকারকে বলছেন সংবাদমাধ্যম সংস্কার করতে, মানে তাদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলছেন শেখ হাসিনার নাম নিতে গেলে তাকে অপরাধী বলতে হবে, নইলে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র?

এদিকে ইউনুসের সরকার কী করছে? তারা ৩০০ জনেরও বেশি জঙ্গি আর চরমপন্থীকে জামিনে ছেড়ে দিয়েছে। শফিউর রহমান ফারাবি, যে অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে আজীবন কারাদণ্ড পেয়েছিল, তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। নাসির উদ্দিন ওরফে শিবির নাসির ২৬ বছর পর মুক্তি পেয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমুদ্দিন রহমানি বেরিয়ে এসেছে। মামুনুল হককে ধর্ষণ মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আর সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, এই চরমপন্থীদের ইউনুস তার সরকারে জায়গা দিয়েছেন। হিযবুত তাহরীরের প্রতিষ্ঠাতা নাসিমুল গনি হয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব। মাহফুজ আলম হয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। এ এফ এম খালিদ হোসেন হয়েছেন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা। মানে দেশটা এখন চরমপন্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পুরোপুরি।

ইউনুস আর তার সরকার দাবি করে তারা সংস্কার করছে, তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনছে। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? প্রতিদিন পুলিশের অভিযানে শত শত মানুষ ধরা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ কমছে না। সেনাবাহিনী নামিয়ে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষ নিরাপদ বোধ করছে না। একদিকে সাংবাদিকদের খুন করা হচ্ছে, আরেকদিকে জঙ্গিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন ধরনের শাসনব্যবস্থা? এটা কোন ধরনের সংস্কার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট ৮৫ জন সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখছে। এটা কেন? এটা কি সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর আরেকটা পথ নয়? প্রতিটা বড় পত্রিকা, প্রতিটা টিভি চ্যানেল এখন এই হয়রানির মধ্যে আছে। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, সমকাল, একাত্তর টিভি, কোথাও কোনো রেহাই নেই। আর এসব করা হচ্ছে ইউনুসের নির্দেশে। যে মানুষটা একদিন দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন, সেই মানুষটাই এখন সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করছেন, তাদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন।

যে দেশে একসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হতো, সেই দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের আওয়ামী ট্যাগ দিয়ে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। বিভু রঞ্জন সরকার তার শেষ চিঠিতে এই কষ্টের কথাই লিখে গেছেন। তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ালেও তাকে আওয়ামী বলে গালি দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন দেশ হলো? এটা কি সেই বাংলাদেশ যে দেশের জন্য লাখো মানুষ জীবন দিয়েছিল? যে দেশের জন্য মা বোনেরা সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন?

ইউনুস আর তার দল যেভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা ছিল একটা পরিকল্পিত অভ্যুত্থান। জুলাইয়ের দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল সুপরিকল্পিতভাবে। বিদেশি টাকা ঢালা হয়েছিল, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো মাঠে নামানো হয়েছিল, সামরিক বাহিনীর একাংশকে সাথে নেওয়া হয়েছিল। আর তারপর একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলা হয়েছিল। এটা গণতন্ত্র নয়, এটা একটা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আর সেই ষড়যন্ত্রের ফলাফল আমরা এখন দেখছি। একটা দেশ পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে।

আজকে বাংলাদেশে কোনো আইনের শাসন নেই। মানুষ রাস্তায় নিরাপদ নয়, ঘরে নিরাপদ নয়। সাংবাদিকরা কলম ধরতে ভয় পায়, মিডিয়া মালিকরা ফোনের অপেক্ষায় থাকেন যে কখন কোন রিপোর্ট নামাতে বলা হবে। জঙ্গিরা খোলাখুলি ঘুরছে, চরমপন্থীরা সরকারে বসে আছে। এটা কোনো দেশ নয়, এটা একটা জঙ্গল হয়ে গেছে। আর এই জঙ্গল তৈরি করেছেন মুহাম্মদ ইউনুস আর তার সরকার।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নতির আশা ছিল কিন্তু সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনো অরক্ষিত। আসলে শুধু অরক্ষিত নয়, অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আগে অন্তত একটা সরকার ছিল, একটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল যারা চেষ্টা করতো কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখতে। এখন সেটাও নেই। এখন যে যার মতো করে চলছে। যার হাতে লাঠি, যার হাতে ছুরি, সেই শক্তিশালী।

বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ নেই। যে দেশটা একদিন উন্নয়নের গল্প শোনাতো, যে দেশের অর্থনীতি এগোচ্ছিল, যে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতো, সেই দেশটা এখন একটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দেড় বছরেই ইউনুস সব ধ্বংস করে ফেলেছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দিয়েছেন, আইনের শাসন শেষ করে দিয়েছেন, গণতন্ত্রকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মানুষের আশা ভরসাও শেষ করে দিয়েছেন।

সাংবাদিকরা এখনো লড়ে যাচ্ছেন। তারা জানেন হামলা হতে পারে, মামলা হতে পারে, এমনকি খুন হতে পারেন। তবুও তারা লিখছেন, তারা সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কতদিন? কতদিন একটা পেশাজীবী মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবে? কতদিন একটা পরিবার ভয়ে থাকবে যে তাদের স্বামী, তাদের বাবা, তাদের ছেলে কাজে গিয়ে আর ফিরবে কিনা?

বিভু রঞ্জন সরকারের মতো একজন প্রবীণ সাংবাদিক যখন মেঘনা নদীতে ভাসতে থাকেন, তখন বুঝতে হবে দেশটা কতটা গভীর অন্ধকারে চলে গেছে। তিনি জানতেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে, তাই তার শেষ লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে পারেনি। কেউ তাকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ যে সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, সেই সরকারই তার শত্রু হয়ে গেছে।

মুহাম্মদ ইউনুস হয়তো ইতিহাসে থাকবেন, কিন্তু একজন মাইক্রোক্রেডিট পথপ্রদর্শক হিসেবে নয়। তিনি থাকবেন একজন মানুষ হিসেবে যিনি তার নিজের দেশকে ধ্বংস করেছেন, যিনি সাংবাদিকতাকে হত্যা করেছেন, যিনি গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছেন, যিনি জঙ্গিদের ক্ষমতা দিয়েছেন। এটাই হবে তার উত্তরাধিকার। আর বাংলাদেশের মানুষ, যারা এখন ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তারা মনে রাখবেন কীভাবে একটা সুন্দর দেশকে নরকে পরিণত করা যায়।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ