ইউনুস সাহেব এবার সারের দাম বাড়িয়ে কৃষকদের শেষ করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। গ্যাসের দাম ৮৩ শতাংশ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশে কৃষি খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার এমন উদ্যোগ কেবল স্বার্থান্বেষী চক্রের কাজ হতে পারে।
এই সরকার যে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেটি এখন আর গোপন বিষয় নয়। জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা সৃষ্টি করে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে দেশের স্বার্থের চেয়ে বিদেশি প্রভুদের তোষণ করাই যেন প্রধান লক্ষ্য। সারের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তও তার আরেকটি উদাহরণ মাত্র।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, কৃষি উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ যায় সারের পেছনে। গ্যাসের দাম বাড়লে সরাসরি প্রভাব পড়বে সারের উৎপাদন খরচে। আর সেই খরচের বোঝা বইতে হবে কৃষকদের। ফলাফল কী হবে? ধানের দাম বাড়বে, চালের দাম বাড়বে, সবজির দাম বাড়বে। সাধারণ মানুষের থালায় খাবার তুলতেই হিমশিম খেতে হবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, বাড়তি টাকা দিয়ে আরও এলএনজি আমদানি করা হবে। এখানেই লুকিয়ে আছে আসল খেলা। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার সুযোগে বিদেশ থেকে দামি দামে এলএনজি আমদানির নামে কার পকেট ভারী হচ্ছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে গ্যাস আছে, কিন্তু সেটি উত্তোলনে বিনিয়োগ না করে বিদেশ থেকে আমদানির পথ বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে মোটা অঙ্কের কমিশন আর দুর্নীতির সুযোগ।
আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে ভর্তুকি কমানোর যুক্তি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের কৃষি খাতকে ধ্বংস করে কি আদৌ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে? ইউনুস সাহেব যে বিদেশি ঋণদাতাদের দালালি করতে গিয়ে দেশের মূল ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছেন, সেটা কি তিনি বোঝেন না, নাকি বোঝার প্রয়োজন মনে করেন না?
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সারের দাম বাড়বে না। কিন্তু গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে সারের উৎপাদন খরচ বাড়বে, এটা তো অঙ্কের হিসাব। তখন হয় সরকারকে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হবে, নয়তো কৃষককে বেশি দামে সার কিনতে হবে। আর আইএমএফের শর্তে ভর্তুকি কমানোর বাধ্যবাধকতা থাকলে শেষ পর্যন্ত দায়টা পড়বে কৃষকের ঘাড়েই। এই সরকার যে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কৃষকদের বোকা বানাচ্ছে, সেটা এখনই স্পষ্ট।
সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, দেশের ৮০ শতাংশ সার আমদানি করা হয়। মাত্র ২০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। এই স্থানীয় উৎপাদনকেও এখন অলাভজনক করে তোলার চেষ্টা চলছে। ফলাফল কী হবে? সার আমদানি আরও বাড়বে। আর সেই আমদানির নামে ডলার পাচার, কমিশন বাণিজ্য আর দুর্নীতির সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে। কৃষক যত সংকটে পড়বে, মধ্যস্বত্বভোগী আর আমদানিকারক চক্রের লাভ তত বাড়বে।
গত এপ্রিলে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। এখন সার কারখানায় ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি। এভাবে একে একে সব সেক্টরকে অলাভজনক করে দেওয়া হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ আসছে না। পুরোনো শিল্পও টিকে থাকতে পারছে না। এদিকে কৃষি খাতকেও এখন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এই পরিকল্পনা কার স্বার্থে, সেটা কি আর বুঝতে বাকি থাকে?
সুদের কারবারে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জনকারী একজন মানুষ যখন দেশ চালানোর দায়িত্ব পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার সব সিদ্ধান্তে মুনাফার হিসাব থাকবে। কৃষক বাঁচলো না মরলো, দেশের মানুষ খেতে পারলো না না পারলো, সেটা তার চিন্তার বিষয় নয়। তার চিন্তা হলো, কীভাবে বিদেশি প্রভুদের খুশি রাখা যায়, কীভাবে আইএমএফের শর্ত পূরণ করে ঋণের কিস্তি আদায় করা যায়।
দেশের চার কোটি কৃষক পরিবার এখন সংকটের মুখে। তাদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু পণ্যের ন্যায্য দাম মিলছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা মুনাফা লুটছে। আর সরকার বসে বসে কৃষিকে আরও কঠিন করে তুলছে। এটাই কি উন্নয়ন? এটাই কি সংস্কার? নাকি এটা দেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার সুচিন্তিত ফন্দি?
কৃষক মরে গেলে আসলে লাভই হবে এই সরকারের। তখন আমদানির নামে আরও বেশি করে বিদেশি পণ্য আনা যাবে। আরও বেশি করে ডলার খরচ করা যাবে। আরও বেশি কমিশনের সুযোগ তৈরি হবে। দেশীয় উৎপাদন যত কমবে, আমদানিনির্ভরতা তত বাড়বে। আর সেটাই তো চায় এই অবৈধ সরকার। কারণ তাদের মূল লক্ষ্য দেশের উন্নতি নয়, নিজেদের পকেট ভরা।
বিদেশি প্রভুদের টাকায় ক্ষমতায় এসে এখন তাদের প্রতিটি নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। আইএমএফ যা বলছে, তাই করতে হচ্ছে। দেশের স্বার্থ, মানুষের স্বার্থ, কৃষকের স্বার্থ, কোনো কিছুরই মূল্য নেই। মূল্য আছে শুধু বিদেশি ঋণদাতাদের শর্ত পূরণ করার। এই হলো অবৈধ সরকারের চরিত্র। এই হলো ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারীদের আসল চেহারা।

