দেশের পুলিশ বাহিনীতে সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি নিয়ে যে কাণ্ড ঘটেছে, সেটা দেখে মনে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মেধা আর যোগ্যতা বলে আসলে কিছু নেই। ২৭৩ জন সাব-ইন্সপেক্টরকে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু যাদের মেধাতালিকায় প্রথম সারিতে থাকার কথা ছিল, তারাই বসে আছেন বঞ্চিত হয়ে। এটা কোন ধরনের সুশাসন, কোন ধরনের সংস্কার?
গত ৩ নভেম্বর আইজিপি বাহারুল আলমের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই পদোন্নতি দেওয়া হয়। সমস্যা হলো, যারা মেধাতালিকায় এক থেকে ছয় নম্বরে ছিলেন, তাদের একজনও পদোন্নতি পাননি। আট থেকে দশ, বারো থেকে বাইশ, চব্বিশ থেকে সাতাশ নম্বরে থাকা কর্মকর্তারাও বাদ পড়ে গেছেন। অথচ তালিকার ৮৮ নম্বরে থাকা একজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এটা যদি মেধাভিত্তিক পদোন্নতি হয়, তাহলে স্বজনপ্রীতি কাকে বলে?
যে সরকার জুলাই মাসে তরুণদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যে সরকার প্রতিদিন সংস্কারের কথা বলে, সেই সরকারের আমলেই পুলিশ বাহিনীতে এমন নগ্ন অনিয়ম হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব ইন্টারনাল ওভারসাইট সিস্টেম থাকার কথা, কিন্তু সেখান থেকে তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই মনগড়া রিপোর্টের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গোপন ভেটিংয়ের নামে আসলে যা খুশি তাই করা হয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, যারা পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তারা সব ধরনের প্রশাসনিক শর্ত পূরণ করেছিলেন। তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ভালো ছিল, বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ২০২০ সাল থেকে রেঞ্জ লিস্টে আছেন। ২৫ আগস্ট মেধাতালিকাও তৈরি হয়েছিল যথাযথভাবে। কিন্তু পদোন্নতি দেওয়ার সময় সেই তালিকা মানা হয়নি। তাহলে মেধাতালিকা তৈরির উদ্দেশ্যটা কী ছিল?
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে সাব-ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতিতে মেধাতালিকার ক্রম অনুসরণ করা হয় না। অনেক সময় বড় কর্মকর্তাদের কাছের লোকদের পদোন্নতি দিতে মেধাতালিকা ভেঙে ফেলা হয়। এটা যদি স্বাভাবিক প্রথা হয়ে থাকে, তাহলে সংস্কারের কথা বলা অন্তর্বর্তী সরকার এখনও কেন এই ব্যবস্থা বদলাতে পারেনি?
সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এর ৮(১) ধারা অনুযায়ী যথাযথ যোগ্যতা থাকলে কাউকে বঞ্চিত করতে হলে লিখিত কারণ দিতে হয়। কিন্তু এখানে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। আইন মানার দায় কি শুধু সাধারণ মানুষের, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়?
পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন যে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটা শুধু অনিয়ম নয়, দুর্নীতি। আর যদি মিথ্যা হয়, তাহলে স্বচ্ছতার সাথে ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। কিন্তু ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কি এই ব্যাখ্যা দেবে?
যে সরকার নির্বাচিত সরকারকে অবৈধ বলে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নিজেদের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন আছে। তারা কোনো নির্বাচনের মাধ্যমে আসেনি, জনগণের ভোটও নেই তাদের পক্ষে। অথচ তারাই এখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক বসাতে ব্যস্ত। পুলিশ বাহিনীতে এই পদোন্নতির ঘটনা তারই একটা নমুনা মাত্র।
মজার বিষয় হলো, যে সরকার জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দিয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নামে, সেই সরকারের আমলেই বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠছে। একজন সিআইডির কর্মকর্তা বলেছেন, তারা সবসময় চেইন-অব-কমান্ড মেনে চলেন, কিন্তু তাদের পদোন্নতিতে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। বৈষম্য এখনও রয়ে গেছে পুলিশ বাহিনীতে। তাহলে জুলাইয়ের সেই আন্দোলন নাটকের কি হলো?
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল সমস্যা হলো তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। তারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন, কারণ জনগণ তাদের ভোট দেয়নি। তারা সংসদেও জবাবদিহি করতে পারবেন না, কারণ সংসদ নেই। তাদের একমাত্র শক্তি হলো তারা যেভাবে ক্ষমতায় এসেছেন। আর সেটা ছিল সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক।
পুলিশ বাহিনীতে এই ধরনের অনিয়ম সামনের দিনগুলোতে আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা যায়। কারণ যখন সরকার নিজেই অবৈধ পথে ক্ষমতায় আসে, তখন আর কোনো নিয়মকানুনই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। মেধার চেয়ে আনুগত্য, যোগ্যতার চেয়ে সংযোগ বেশি গুরুত্ব পায়।
ড. ইউনুসের সরকার প্রতিদিন সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু নিজেদের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী ঘটছে সেদিকে নজর নেই। পুলিশে এই পদোন্নতির ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে তথাকথিত সংস্কার আসলে শুধুই বুলি। বাস্তবে যা হচ্ছে তা হলো দুর্নীতির নতুন সংস্করণ।
যারা মেধাবী, যারা নিয়মকানুন মেনে চলেন, যারা কঠোর পরিশ্রম করে যোগ্যতা অর্জন করেন, তাদের জন্য এই ব্যবস্থায় কোনো জায়গা নেই। আর এটাই হয়তো সবচেয়ে দুঃখজনক দিক। একটা দেশ তখনই এগিয়ে যায় যখন মেধা আর যোগ্যতাকে মূল্য দেওয়া হয়। কিন্তু যখন তালিকার ৮৮ নম্বরে থাকা কাউকে পদোন্নতি দেওয়া হয় আর এক থেকে ছয় নম্বরে থাকারা বসে থাকেন, তখন বুঝতে হবে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে।
জুলাই দাঙ্গার পর থেকে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সর্বত্রই যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের এই পদোন্নতির ঘটনা সেই বড় চিত্রেরই একটা অংশ। আর এসবের দায়ভার পুরোপুরি অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর, যারা নিজেরাই একটা অবৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে।

