বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রক্তক্ষয় থেমে গেলেও আইন ও বিচারের পাতায় দাগ আর কলঙ্ক ক্রমেই গাঢ় হচ্ছে। শেখ হাসিনা হয়তো ছিলেন একজন ত্রুটিপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী এবং পরিবারতন্ত্রের ধারক এক স্বৈরাচারী শাসক কিন্তু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) তার বিচার ও রায় শুধু প্রহসনই নয়, তা ছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলা।
এই বিচার প্রক্রিয়ায় আইনের মৌলিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নিয়মকানুনকে নির্বিচারে বাঁকানো হয়েছে, সংবিধানের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা উপেক্ষা করা হয়েছে, আর পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের সারিতে দাঁড় করিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার রূপ দেওয়া হয়েছে।
আইসিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ভিত্তিতে। ওই আইন এবং ২০০৮ সালের সংশোধনী মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে তৈরি।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে সংশোধনীগুলো আইসিটিতে আনা হয়েছে, সেগুলো জারি করা হয়েছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে, যা শুরু থেকেই অসাংবিধানিক। সে সময়ে কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না, এবং সংসদও এসব সংশোধনী অনুমোদন করেনি। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন কেবল তখনই, যখন সংসদ আইনসম্মতভাবে ভেঙে দেওয়া হয় এখানে তা হয়নি।
২০২৪ সালের ১০ আগস্ট ছাত্র-জনতার একটি অংশের দেওয়া “আলটিমেটাম”-এর পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতি ও আরও পাঁচজন বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এর পরবর্তীতে আইসিটিতে যে তিনজন বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সবাই সংবিধান লঙ্ঘন করে নিয়োগপ্রাপ্ত।
চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজা মজুমদার অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ; মাত্র ছয় দিন আগে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দ্বিতীয় বিচারপতি মহিতুল হক মোহাম্মদ এনাম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ। তৃতীয় বিচারপতি আইনজীবী শফিউল আলম মাহমুদ সম্প্রতি হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছেন।
তিনজনকেই সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে স্থায়ী বিচারপতি করা হয়েছে, যেখানে নিয়ম হলো অতিরিক্ত বিচারপতিকে কমপক্ষে দুই বছর সন্তোষজনকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক বছরের মধ্যেই জামায়াত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ২২ জন বিচারপতিকে স্থায়ী করা হয়েছে, যাদের কারো আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার জন্য অপরিহার্য।
শফিউল আলম মাহমুদের বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ আছে। ২০১৯ সালে তিনি বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী হয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে জয়ী হন। তাই আইসিটি প্যানেলে তার উপস্থিতি ট্রাইব্যুনালকে পক্ষপাতদুষ্টই করে তুলেছে।
প্রসিকিউশন ও ডিফেন্স উভয় লাইনআপই আগে থেকে সাজানো ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আগে ছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান আইনজীবী। তাকে জামায়াত-ই ইসলামী যেন ১৯৭১–এর বিচারগুলোর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই বেছে নিয়েছে।
তার উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান আওয়ামী লীগ আমলে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন,যা নিয়োগকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্ত মাত্র এক মাসে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে রায় পূর্বনির্ধারিত ছিল।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, তিনি নিজের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পাননি। রাষ্ট্র তার জন্য নিয়োগ দেয় মোহাম্মদ আমির হোসেনকে যার আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে অভিজ্ঞতা নেই। তিনি নিজেই বলেছেন, আমি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। এ ধরনের সুযোগ রাখে এমন কোনো বিধান নেই। তারাও আমার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।
২০২৫ সালের আগস্টে জেড আই খান পান্না তার পক্ষে দাঁড়াতে চাইলে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর হাতে ১৩৫ পৃষ্ঠার চার্জশিট এবং আরও ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার নথি দেওয়া হয় বিচার শুরুর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে। তবুও তিনি অতিরিক্ত সময় চাননি, এবং সাক্ষীদের জেরা করার অনুমতিও পাননি, যা ন্যায্য বিচারের মূল কাঠামোকেই আঘাত করে।
হাসিনার বিরুদ্ধে উপস্থাপিত টেলিফোন আলাপের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়নি, যদিও তিনি প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশের কথা অস্বীকার করেছেন। বিক্ষোভকারীদের নিহত হওয়ার ঘটনায় ব্যবহৃত গুলির ক্যালিবার পুলিশি অস্ত্রের সঙ্গে মেলে কি না সেটাও ফরেনসিক তদন্তের আওতায় আনা হয়নি।
আদালত আসামিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই আদালতের সামনে হামলার শিকার হন সেটাও বিচারকে কলুষিত করেছে। বিচার শুরুর আগেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শেখ হাসিনা ও অন্যদের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ঘোষণা করেন, “শেখ হাসিনাকে ১৮ নভেম্বর আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে… জুলাই–আগস্টের গণহত্যার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। আজ আমাদের জন্য ঐতিহাসিক দিন।”
মুহাম্মদ ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম আরও কঠোরভাবে বলেন “হাসিনা দেশে ফিরতে পারবে না, ফিরলে কেবল ফাঁসির মঞ্চেই হাঁটতে পারবে।”
শেখ হাসিনাকে পলাতক ঘোষণা করার পরও অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এ কেন যায় না সেটাই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ তো রোম স্ট্যাটিউট ২০১০ সালে অনুমোদন করে আইসিসি সদস্য হয়েছে। উত্তরটা স্পষ্ট এই বিচার প্রক্রিয়া আইসিসির সামনে টিকেই না।
এই বিচারকে প্রহসনে পরিণত করে বাংলাদেশ নিজেকে আরও দ্রুত উন্মাদ জঙ্গিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। একটাই আশা এই আইনি বিপর্যয়গুলো এতটাই ভয়াবহ যে কোনো নির্বাচিত সরকার, যে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য, ক্ষমতায় এলে এগুলো স্থায়ী হতে দেবে না।

