বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো ক্রমশ তীব্রতর হয়ে উঠছে। সর্বশেষ একটি ঘটনায়, নাঙ্গলকোট উপজেলার ঢালুয়া ইউনিয়নের চিওড়া গ্রামের ১৪ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ইমরান হোসেনকে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই ঘটনা শিশু অধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছে, যেখানে অনেকে এটাকে ‘প্রতিহিংসামূলক দমননীতি’র নমুনা বলে অভিহিত করছেন।
ইমরানের বয়স মাত্র ১৪ বছর—যে বয়সে একটি শিশু স্কুলের ছুটি নিয়ে ফুটবল খেলতে বা বন্ধুদের সাথে খেলাধুলায় সময় কাটায়। কিন্তু সম্প্রতি নাঙ্গলকোট থানা পুলিশ বিনা মামলায় বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই তার বাড়িতে হানা দিয়ে তাকে আটক করে নিয়ে যায়। পরিবারের ভাষ্য, ইমরানের পিতা ইসহাক মিয়া মারাত্মক অসুস্থ—কাঁপা হাতে ছেলের জন্মসনদ, স্কুল আইডি কার্ড, রোল নম্বরসহ সব ডকুমেন্ট নিয়ে থানার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। তিনি কর্মকর্তাদের পায়ে পড়ে বলছেন, “আমার ছেলে বাচ্চা… ও রাজনীতি জানেই না। ও তো স্কুলের ছেলে।” বাবা-পুত্রের এই দৃশ্য স্থানীয়দের মনে ভয় আর ক্রোধ জাগিয়ে তুলেছে। ঘটনার পটভূমি।
আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করার পর থেকে তার সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই অভিযানে নির্বিচারে গ্রেফতার হচ্ছে—এমনকি শিশু এবং নিরীহ নাগরিকরাও। ইমরানের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ উল্লেখ না করে শুধু ‘ছাত্রলীগ ট্যাগ’ লাগিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা শিশু অধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি এবং ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ইসহাক মিয়া ছেলের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র হাতে নিয়ে প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। তিনি বলেন, “ওর পরীক্ষা আজ থেকে। কিন্তু পুলিশ বলছে, ছাত্রলীগ বলে আটক করেছে। আমার ছেলে তো স্কুলে পড়ে, রাজনীতির সাথে কোনো যোগ নেই।” এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সমগ্র দেশের নৈতিকতা ও আইনবোধের প্রশ্ন তুলেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইউনূস প্রশাসনের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ তুলে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেফতার, নির্যাতন এবং অতিরিক্ত বিচারিক হত্যা চলছে। একইসাথে, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযানে শত শত শিক্ষার্থী গ্রেফতার হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই নির্দোষ।
স্থানীয় অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ধরনের গ্রেফতার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার। একজন অ্যাকটিভিস্ট বলেন, “এটা আর প্রশাসন নয়, এটা একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ দানবীয় মেশিন। লক্ষ্য শুধু ভয় দেখানো এবং দমন করা।” ইউনুস প্রশাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে, তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিরোধীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও গভীর করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পটভূমিতে এমন ঘটনা দেশে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইতিমধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইউএন মানবাধিকার কমিশনের মতে, শিশু গ্রেফতারের মতো ঘটনা ‘যুদ্ধাপরাধের মতো’ এবং এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ইমরানের মতো শত শত শিশু এবং যুবক এখন ‘বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে জেলে পচছেন। এই অবস্থা দেশে আইনের শাসনের অভাব এবং অবৈধ ক্ষমতার উন্মত্ততা প্রমাণ করছে। অধিকারকর্মীরা দাবি করছেন, ইমরানকে অবিলম্বে মুক্তি দিন এবং এমন লঙ্ঘন বন্ধ করুন।

