রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের উন্নয়নযাত্রা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই একের পর এক সরকারি প্রকল্পে কাজ বন্ধ বা মন্থর হয়ে যায়। এই স্থবিরতার ঢেউ এখন শুধু শহর নয় গ্রাম, মফস্বল, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, নদীখনন এলাকা সবখানে। যে বাংলাদেশ কয়েক বছর আগেও সেতু, মহাসড়ক, রেললাইন, বন্দর ও নদী পুনর্খননে ব্যস্ত ছিল, সেখানে এখন নীরবতা। কাজের শব্দ নেই, ট্রাকের ধুলো নেই, ক্রেনের আলো নেই শুধু থেমে থাকা প্রকল্পের স্তব্ধ অবস্থা।
ধ্বংসের মুখে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি একটি অচল দেশের প্রতিচ্ছবি
উন্নয়ন থেমে যাওয়ার প্রথম আঘাত লেগেছে যন্ত্রপাতিতে। একসময় যে ভেকু, স্কেভেটর, ডোজার, রোড রোলার, ট্রাক, ক্রেন, নৌযান, মিক্সার প্ল্যান্ট ও জেনারেটর দিনরাত চলত সেগুলো এখন মাসের পর মাস একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
মেশিনারি যত বেশি সময় স্থির থাকে—ইঞ্জিন ভেতরেই মরিচা ধরে, হাইড্রোলিক সিল ফেটে যায়,রাবার পার্ট শুকিয়ে চিরে ওঠে,ব্যাটারি মৃত হয়ে যায়, ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিট অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এক সময়ের কোটি টাকার সম্পদ আজ মালিকদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৫০ ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি এখন অচল অবস্থায় পড়ে আছে, যেগুলোর বাজারমূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। তার ওপর গ্যারেজিং খরচ, সুদ, কিস্তি সব মিলিয়ে এটি যন্ত্রের নয়, মালিকদেরও ধ্বংসের যাত্রা।
দক্ষ শ্রমিকের পতন মেশিনের মাস্টার এখন রিক্সা টেনে বাঁচছেন
উন্নয়ন প্রকল্প থেমে যাওয়ার আরেকটি ভয়াবহ ক্ষতি দেখা যাচ্ছে মানবসম্পদে। যে স্কেভেটর অপারেটর কয়েক বছর ধরে কোটি টাকার মেশিন পরিচালনা করতেন, যে ক্রেনম্যান হাজার টন মালামাল তোলার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যে সার্ভেয়ার, ওয়েল্ডার, ড্রিলিং বিশেষজ্ঞ ও ট্রাক ড্রাইভার প্রকল্পের প্রাণ ছিলেন— সেই দক্ষ শ্রমিকরা আজ কাজহীন।
এদের অনেকে রিক্সা, মোটরবাইক বা ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা চালাচ্ছেন। কেউ দৈনিক ৮০০ টাকা আয় করছেন, কেউ ৭০০—যাদের দক্ষতা গড়ে উঠতে লেগেছিল প্রায় এক দশক। দক্ষতা থাকলেও কাজ না থাকলে সেই দক্ষতার মূল্য শূন্যে নেমে যায়। এখন দেশের নির্মাণশক্তি ধীরে ধীরে পেশা বদলে যাচ্ছে—আর কতজন ফিরবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রেমিটেন্সের শিরায় চাপ
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে রেমিটেন্সের ওপর দাঁড়িয়ে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর—যেখানে লাখ লাখ দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিক বিদেশে যেতেন, সেই পথ এখন সংকুচিত। আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা, নতুন চুক্তি স্থগিত—সব মিলিয়ে বিদেশগমনের সংখ্যা হঠাৎ কমে গেছে।
ফলে—যাদের যাওয়ার কথা ছিল তারা দেশে আটকে আছেন। ঋণ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া পরিবারগুলো বিপদে। শ্রমিকেরা কাজ না পেয়ে দেশে কম আয়ের খাতে নেমে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। রেমিটেন্স কমে পুরো অর্থনীতি ধীরে ধীরে চাপের মুখে পড়ছে। একসময় যে শ্রমিক বিদেশে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে শিরা-উপশিরায় টাকা পাঠাতেন—তিনি আজ একটি পরিত্যক্ত প্রকল্পের পাশের চায়ের দোকানে বসে দিন পার করছেন।
অর্থনীতির অদৃশ্য ক্ষয়—এক স্থবিরতার ঢেউ পুরো বাজারে
উন্নয়ন প্রকল্প থেমে গেছে মানে শুধু মাটি কাটার কাজ থেমে যায়নি— এক সাথে থেমে গেছে শতাধিক খাতের কার্যক্রম। খরচ কমেছে, ফলে তেল ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। ইস্পাত, সিমেন্ট, বালি, পাথরের ডিপোতে স্তূপ জমে যাচ্ছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকরা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন—ভাড়া নেই।
হোটেল, চায়ের দোকান, গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ—সবখানে ব্যবসা অর্ধেকে নেমেছে। ব্যাংক ঋণ খেলাপি বাড়ছে, প্রকল্পের কিস্তি বকেয়া জমছে। উন্নয়ন খাতের থেমে যাওয়া শুধু একটি খাতের ক্ষতি নয়—এটি অর্থনীতির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ধ্বংসের ঢেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
উপসংহার—একটি থেমে যাওয়া দেশের প্রতিচ্ছবি
উন্নয়ন থেমে যাওয়ায় যে নিঃশব্দ ক্ষয় প্রতিদিন দেশকে গ্রাস করছে—তা কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। দেখতে পাওয়া যায়— ধ্বংস হয়ে যাওয়া মেশিন, পেশাহারা দক্ষ শ্রমিক, বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আটকে থাকা মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আর অর্থনীতির গভীরে ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতা। এ থেমে থাকা শুধু নির্মাণ কাজের নয়—এ থেমে থাকা একটি দেশের সামগ্রিক গতির, সামর্থ্যের এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের।

