পাঁচ দিনের ব্যবধানে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের পুলিশ তাদের ইউনিট প্রধানদের কাছ থেকে নাশকতাকারীদের গুলির নির্দেশ পেয়েছে। এই নির্দেশের আইনি ভিত্তি হিসেবে পুলিশ দেখাচ্ছে দণ্ডবিধিতে উল্লিখিত ‘ব্যাক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার’কে।
কিন্তু আইনের বইয়ের এই ধারাকে রক্ষাকবচ বানিয়েই অতীতে ‘ক্রসফায়ার’ এর মত বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনাগুলো ঘটেছে। একযুগ আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা কর্মসূচির সময় যখন জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়েছিল, তখনও একই আইন দেখিয়ে বিরোধী নেতা-কর্মীদের গুলি করা হয়েছিল, ঘটেছিল গুমের ঘটনাও।
আইনজীবী ও সাংবাদিকরা বলছেন, অতীতে এ আইনি এবং এ ধরনের নির্দেশনার অপব্যবহার হয়েছে নানাভাবে। এবারও তেমন কিছু ঘটবে কি না, সেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল নিক্ষেপ করতে এলে গুলির নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। রোববার বিকেলে ডিএমপির ওয়্যারলেস চ্যানেলগুলোতে কমিশনার এই নির্দেশনা দেন। পাঁচ দিন আগে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ একই ধরনের নির্দেশ দিলে তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
অপব্যবহারের ‘অতীত’
বিগত বিএনপির শাসনামলে ২০০৪ সালে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে র্যাব গঠন করা হয়। তখন থেকেই শুরু হয় ‘ক্রসফায়ারের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার মিছিল।
২০০৪ পরবর্তী পুরো বিএনপির আমল এবং পরের তত্ত্বাবধায়ক (২০০৭-২০০৮) সরকারের আমলে ক্রসফায়ার অব্যাহত থাকে। আইনের বইয়ের এই আত্মরক্ষার ধারাকে তখন থেকেই রক্ষাকবচ বানিয়ে আসছে বাহিনীগুলো। ২০০৮ সালে যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল, সেই নির্বাচনী ইশতেহারে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তারা বন্ধ করবে।
আওয়ামী লীগের প্রথম ২০০৯-২০১৩ মেয়াদের শাসনামলে ক্রসফায়ারের সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও নতুন কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয় ‘গুম’। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নেওয়া অনেকেই হত্যার শিকার হন, যাদের লাশ পড়ে ছিল শহরতলীর রাস্তার পাশে, নদীতে কীংবা কোন জংলায়। আবার ধরে নেওয়া অনেকে কখনো ফেরেননি, অনেককে দীর্ঘ সময় গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গত বছরের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়ে এখন বিচারের অপেক্ষায় আছে। অন্তর্বর্তী সরকার গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতনের সেই কৌশল ও ভুক্তভোগীদের বয়ানগুলোকে সামনে এনে প্রচার করছে।
ক্রসফায়ারের নামে হত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকবচ হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বরাবরাই আইনে উল্লেখিত ‘ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার প্রাধিকারে’র দোহাই দিয়ে আসছিল। এমনকি গত বছর জুলাই আন্দালনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর ঢালাওভাবে গুলি চালানোর অজুহাত হিসেবেও এ আইনকে হাজির করেছিল তারা।
হাসিনা পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার কথা বললেও তাদের আমলেও অন্তত ৪০টি এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনার কথা জানাচ্ছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’, দীর্ঘদিন যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।
আবার গুলির নির্দেশনা
জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘনিয়ে আসায় ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বিক্ষোভ ও ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দেয় কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞায় থাকা আওয়ামী লীগ।
শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণার জন্য সোমবার দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। এ দিনটি ঘিরে আওয়ামী লীগ অনলাইনে রোববার থেকে দুই দিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি আর যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে গত কয়েক দিন ধরেই। তার মধ্যে ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে গুলির নির্দেশনা এল।
জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “আমি ওয়্যারলেসে বলেছি যে কেউ বাসে আগুন দিলে, ককটেল মেরে জীবনহানির চেষ্টা করলে তাকে গুলি করতে। এটা আমাদের আইনেই বলা আছে।”
বিকেলে ডিএমপি সদর দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কক্ষে কয়েকজন কর্মকর্তা এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন। ওই কর্মকর্তা দণ্ডবিধির বই থেকে ৯৬ থেকে ১০৬ ধারাগুলো বের করে দেখান, যেখানে আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
দণ্ডবিধির ৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, “ব্যাক্তিগত প্রতিরক্ষার অধিকার প্রয়োগকালে কৃত কোনোকিছুই অপরাধ নহে।” তবে গত সপ্তায় সিএমপি কমিশনারের গুলির নির্দেশের পরদিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানায় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সংস্থাটি বলেছে, দেশের সংবিধান যে কোনো নাগরিকের জীবনের অধিকার এবং আইনের আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়। সন্দেহভাজন অপরাধীকেও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া হত্যা বা গুলি চালানোর নির্দেশ ‘কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’।
২০১৩-২০১৪ সালের দিকে জ্বালাও পোড়াওয়ের ঘটনা এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কর্মীদের ‘ক্রসফায়ার’ ও গুমের সময়টার ঘটনাপ্রবাহ মনে করিয়ে দিয়ে ঢাকার সাংবাদিক মো. মুক্তাদির রশীদ রোমিও বলেন, “আগেও এর অপব্যবহার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। পুলিশের যে সংস্কার হয়নি এইসব নির্দেশ তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।”
তিনি বলেন, “কেবল চটকদার জনপ্রিয়তার জন্য পোশাকি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি পুলিশ গণহারে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। গ্রেপ্তার, মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য যেসব কাজের জন্য পুলিশ বিতর্কিত ছিল সেগুলোই ফিরিয়ে আনার যুক্তি খুঁজছে।
“এর ফলে মূলত আইনের যে শাসন, তার পরিবর্তে পুলিশকেন্দ্রিক ক্ষমতার ব্যবস্থাপনা আবারও পুনরুজ্জীবিত হবে। একটা গোষ্ঠীকে ক্রিমিনাল ট্যাগ দিয়ে তার ওপর সামাজিক নায্যতা তৈরির যে কৌশল, সেটিই আমরা ঘুরে ফিরে দেখতে পাচ্ছি। এতে করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আইনের শাসন। আমরা চাই পুলিশ তার পেশাদারত্বের মধ্য দিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালিত করুক।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিকও পুলিশের গুলির নির্দেশের মধ্যে ‘শঙ্কার’ কারণ দেখছেন। “আইনে যে গুলি করার ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে, অতীতে তো আমরা এই ক্ষমতার অপব্যবহারই দেখেছি কেবল। এর বাস্তব ব্যবহার তো তেমন দেখা যায়নি। কাজেই এই সময়ে এসে হঠাৎ সবাই ভালো হয়ে যাবে–এমন আশা তো দেখছি না।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পুলিশের সাবেক আইজি নূরুল হুদা বলেন, “অপব্যহারের সুযোগ আছে এটা সত্য। কেননা এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ব্যবহার করে থাকে। তবে এখানে পরিস্থিতি কী–সেটার উপর নির্ভর করে।”

