বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি—তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতের উপর নির্ভর করে চলছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সিংহভাগ, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা, এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতি। কিন্তু চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই এই প্রধান স্তম্ভটি কেঁপে উঠছে একের পর এক বিপদের ইঙ্গিতে।
অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকেই রপ্তানি আয় কমতে শুরু করেছে, এবং টানা তিন মাস ধরে সেই পতন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ অক্টোবর মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ শতাংশ—যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। আরও ভয়াবহ দিক হলো—এই পতনের মূল ভার পড়েছে তৈরি পোশাক খাতের ওপর, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়।
এই পতন কেবল সংখ্যার হিসাব নয়—এটি শ্রমিকের ঘাম, উদ্যোক্তার আত্মত্যাগ আর দেশের বৈদেশিক আয়ের ভবিষ্যতের সাথে জড়িত এক গভীর সংকেত।
অক্টোবর মাসে বিদেশি ক্রেতাদের নতুন অর্ডার কমেছে আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ। অর্থাৎ, ৩৯ কোটি ডলারের অর্ডার হারিয়েছে বাংলাদেশ, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৪,৭৫৮ কোটি টাকার সমান। অর্ডার কমে যাওয়ার অর্থ হলো ভবিষ্যতের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ভয়াবহ প্রভাব পড়া। সাধারণত রপ্তানির অর্ডার পাওয়ার পর উৎপাদন ও ডেলিভারিতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। তাই আজকের এই আদেশ সংকট আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে আরও গভীর অর্থনৈতিক ধস ডেকে আনতে পারে।
ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়েছে, কোথাও মজুরি বিলম্বিত হচ্ছে। যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে গার্মেন্টস খাতের বহু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। এটি কেবল রপ্তানি হ্রাস নয়—এটি একটি সামাজিক সংকটের পূর্বাভাস।
লক্ষ লক্ষ শ্রমিক পরিবার নির্ভর করে এই খাতের উপর। গার্মেন্টস শিল্পের বিপর্যয় মানে সেই পরিবারগুলোর আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিশুদের শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়া, এবং সমাজে নতুন দারিদ্র্যের তরঙ্গ সৃষ্টি হওয়া।
অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা পুরো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতির দায় শুধু বৈশ্বিক মন্দা বা ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে অর্ডার হ্রাস নয়। এর পেছনে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা, নীতি অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, এবং এক অনির্বাচিত সরকারের অদূরদর্শিতা।
যে সময় দেশের অর্থনীতি রক্ষায় সরকারকে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হতো—জ্বালানির নিশ্চয়তা, ডলারের স্থিতিশীলতা ও রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো—সে সময় চলছে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, বিদেশি তোষণ আর নীতিহীন প্রশাসনিক অচলাবস্থা।
অভ্যন্তরীণ দালালচক্র, নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা, আর বিদেশি স্বার্থে আত্মসমর্পণ—সব মিলিয়ে গার্মেন্টস শিল্প আজ এক ভয়াবহ ঘূর্ণাবর্তে আটকে গেছে।
যখন দেশের শিল্পখাত রক্ষা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার সময়, তখন একদল দালাল ব্যবসায়ী ও বিদেশি স্বার্থান্ধ বুদ্ধিজীবী নানা প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দেশের স্বার্থবিরোধী বার্তা ছড়াচ্ছে।
যে সময় রাষ্ট্রকে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে মনোযোগ দিতে হতো, সেই সময় চলছে রাজনৈতিক নাটক আর মিডিয়া প্রদর্শনী। বাস্তবতা হলো—দেশের গর্ব গার্মেন্টস খাত আজ আত্মরক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত, অথচ কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। রপ্তানি খাতের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
যদি এখনই রপ্তানি খাতকে রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়—শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্থিতিশীল করা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক বাজারে আস্থা পুনর্গঠন করা—তাহলে সেই দিন আর দূরে নয়, যখন একের পর এক গার্মেন্টস কারখানায় তালা ঝুলবে, আর হাজারো শ্রমিকের মুখে নামবে অনিশ্চয়তার ছায়া।
অনির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতা, দালাল রাজনীতির দখল আর নীতি অচলাবস্থাই আজ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশের রপ্তানি খাতের এই বিপর্যয় আমাদের কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—এটি এক জাতির আত্মবিশ্বাসের পতনও।

